বলিউডের ইতিহাসে ‘থ্রি ইডিয়টস’ শুধু তিন বন্ধুর গল্প ছিল না, এই সিনেমা ছিল উপমহাদেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নীরব কিন্তু তীব্র বিদ্রোহ। পরীক্ষার খাতায় প্রাপ্ত নম্বর, র্যাঙ্ক আর সাফল্যের একমাত্র সংজ্ঞার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই সিনেমা এমন এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল, যেখানে প্রাধান্য পেয়েছিল-শেখাটাই আসল। ছবির মূল তিন চরিত্র র্যাঞ্চো, ফারহান ও রাজু শিখিয়েছিল প্রশ্ন করতে, নিজের স্বপ্ন বেছে নিতে এবং ভয় জয় করতে।
র্যাঞ্চোর চরিত্রে ছিলেন আমির খান, ফারহান হিসেবে আর মাধবন এবং রাজু চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শরমন জোশী। সিনেমা পেরিয়ে এই চরিত্রগুলো জায়গা করে নিয়েছিল শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনে। বহু তরুণ নিজের ভেতরের র্যাঞ্চো-ফারহান-রাজুকে সেখানে খুঁজে পেয়েছিল বলেই এই সিনেমা ‘কাল্ট’ হয়ে ওঠে। প্রথম বলিউড ছবি হিসেবে থ্রি ইডিয়টসই মুক্তির পর ২০০ কোটি রূপি আয়ের ক্লাবে প্রবেশ করেছিল।
এমন অভূতপূর্ব সাফল্য, ব্যতিক্রমী গল্প ও নজরকাড়া নির্মাণ শৈলীতে সিনেমাটির পরিচালক রাজকুমার হিরানিও ভূয়সী প্রশংসা কুড়ান। অনেক বছর ধরেই থ্রি ইডিয়টস সিনেমার সিক্যুয়েলের কথা শোনা যাচ্ছিল। অবশেষে জানা গেল, ২০২৬ সালেই থ্রি ইডিয়টস-টু এর শুটিং শুরু হবে।
পিঙ্কভিলা, ইন্ডিয়া টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এরইমধ্যে সিনেমার চিত্রনাট্য চূড়ান্ত হয়ে গেছে। প্রযোজনায় থাকছেন বিধু বিনোদ চোপড়া, রাজকুমার হিরানি এবং আমির খান।
সিনেমা বোদ্ধাদের মতে, বিশ্ব নন্দিত সিনেমার সিক্যুয়েলের নির্মাণের ক্ষেত্রে এই তিনজনের দল যে নিশ্চয়তার নাম, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
সিক্যুয়েলের ঘোষণার মাঝেই আরও এক সুখবর দিয়েছেন বলিপাড়ার সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, থ্রি ইডিয়টস-টু এর ক্ষেত্রে পরিচালক থেকে অভিনয়শিল্পী- কেউই পরিবর্তন হচ্ছেন না।
এ সিনেমায়ও র্যাঞ্চো চরিত্রে থাকবেন আমির খান, ফারহান চরিত্রে আর মাধবন, রাজু হিসেবে শরমন যোশী এবং পিয়া চরিত্রে আবারও কারিনা কাপুরকেই দেখা যাবে। নতুন ছবির গল্প শুরু হবে ঠিক সেখান থেকেই, যেখানে প্রথম ছবি শেষ হয়েছিল। অর্থাৎ, তিন বন্ধুর আলাদা হয়ে যাওয়ার প্রায় ১৭ বছর পর।
তবে সিক্যুয়েলে চমক থাকবে হৃদয়ে গেঁথে থাকা এসব চরিত্রে। বাস্তববাদী করতে চরিত্রগুলোর বর্ধিত বয়স রাখছেন নির্মাতা। তাদের জন্য বদলেছে প্রশ্নও। ১৭ বছর পরও র্যাঞ্চোর আদর্শ কি কর্পোরেট বাস্তবতায় টিকে আছে? ফারহান কি সত্যিই নিজের পছন্দের কাজটা করতে পেরেছে? রাজু কি এখনও ভয় আর দায়িত্বের টানাপোড়েনে আটকে?
ধারণা করা হচ্ছে, এবার গল্পটা শুধু শিক্ষা ব্যবস্থায় আটকে থাকবে না। কর্মজীবন, সাফল্যের সংজ্ঞা, মানসিক শান্তি, বন্ধুত্বের বদলে যাওয়া রূপ—সব মিলিয়ে ‘সিস্টেম বনাম স্বপ্ন’-এর লড়াইটা যাবে আরও বড় ক্যানভাসে।
সিনেমায় বুদ ক্রিটিকসরা অবশ্য বলছেন, এই ছবির সবচেয়ে বড় শত্রু তার প্রথম অংশ। ‘থ্রি ইডিয়টস’ কেবল সিনেমা নয়, এক ধরনের সাংস্কৃতিক মাইলফলক। সেটাকে হুবহু নকল করলে বিপদ। আবার সম্পূর্ণ অস্বীকার করলে দর্শক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। নতুন ছবির সামনে তাই একটাই রাস্তা-পুরোনো আবেগকে সম্মান করে সামনে এগোনো।
আমির খান আর রাজকুমার হিরানির কাজের ইতিহাস দেখলে আশা করা যায়, থ্রি ইডিয়টস-টু শুধু নস্টালজিয়া বিক্রির চেষ্টা হবে না, বরং সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এক প্রজন্মের গল্প বলার চেষ্টা থাকবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ছবির জন্য দুজনেই আপাতত তাদের পরিকল্পিত দাদাসাহেব ফালকে বায়োপিক স্থগিত রেখেছেন। সিনেমাটির চিত্রনাট্য নিয়ে তারা পুরোপুরি সন্তুষ্ট ছিলেন না বলেই এই সময়টুকু ‘থ্রি ইডিয়টস-টু’-এর চিত্রনাট্য তৈরিতে কাজে লাগিয়েছেন তারা।
‘থ্রি ইডিয়টস’ আমাদের শিখিয়েছিল- ‘অল ইজ ওয়েল’ মানে ‘সব ঠিক আছে’ নয়, বরং বিশ্বাস রাখার নাম। এ বিশ্বাস নিজের ওপর, নিজের সিদ্ধান্তে চলা পথের ওপর। সিক্যুয়েল যদি সেই বিশ্বাসটুকু আবার ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলেই তার সার্থকতা। বাদ বাকি সব বক্স অফিসের হিসাব।


