৬৫টি গিটার। অসংখ্য গান। আর এমন এক সুর, যা মৃত্যুর আট বছর পরও বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে অনুরণিত। আইয়ুব বাচ্চুর কাছে গিটার কখনোই শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র ছিল না। সেটি ছিল তার সঙ্গী, নেশা এবং সংগীতের ভাষা।
‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’ গানের প্রথম কয়েকটি সুর আজও একটি প্রজন্মকে ফিরিয়ে নেয় অন্য এক সময়ে। ‘চলো বদলে যাই’ শুরু হলে মুহূর্তেই কণ্ঠ মেলান শ্রোতারা। আর ‘এই রূপালি গিটার’ বাজলেই মনে পড়ে সেই মানুষটির কথা, যিনি গিটারকে বাঙালির আবেগের সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী। গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে তার পরিচিতি থাকলেও গিটারই ছিল তার সবচেয়ে আপন মাধ্যম।
সংগীতজীবনের শুরুতে ফিলিংস ও সোলসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পরে ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন লাভ রান্স ব্লাইন্ড (এলআরবি)। ব্যান্ডটির মাধ্যমে বাংলাদেশের রক সংগীতকে তিনি আরও বড় পরিসরে পৌঁছে দেন। ‘এলআরবি’, ‘সুখ’, ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’ ও ‘ফেরারি মন’-এর মতো অ্যালবাম হয়ে ওঠে দেশের ব্যান্ড সংগীতের উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
এরও আগে ১৯৮৬ সালে অ্যালবাম ‘রক্ত গোলাপ’ দিয়ে শুরু হয় তার একক ক্যারিয়ার। এরপর প্রকাশিত হয় ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘একা’, ‘প্রেম তুমি কী’ ও ‘দুটি মন’। এর মধ্যে ‘কষ্ট’ বিশেষভাবে শ্রোতাপ্রিয়তা পায়।
তার কণ্ঠ ও সুরে একের পর এক গান মানুষের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘ফেরারি এই মনটা আমার’, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’ , ‘এখন অনেক রাত’ , ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’ কিংবা ‘উড়াল দেব আকাশে’ প্রতিটি গানই তৈরি করেছে আলাদা স্মৃতি।
শুধু ব্যান্ড বা একক গানেই থেমে থাকেননি বাচ্চু। চলচ্চিত্রেও তার সংগীত প্রতিভার ছাপ রয়েছে। ‘আম্মাজান’, ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’ ও ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’-র মতো গানের মাধ্যমে সিনেমার দর্শকদের কাছেও পৌঁছে যায় তার সুর ও কণ্ঠ।
তরুণ সংগীতশিল্পীদের প্রতিও ছিলেন তিনি উদার। গিটারপ্রেমীদের উৎসাহ দেওয়া থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানো-সংগীতকে তিনি দেখতেন একটি চলমান উত্তরাধিকার হিসেবে।
২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যু বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে তৈরি করে গভীর শূন্যতা। তবে শিল্পীর ক্ষেত্রে মৃত্যু যেন সবকিছুর শেষ নয়। তার গান থেকে যায়, সুর থেকে যায়, আর থেকে যায় সেই রূপালি গিটার।
আজ তার জন্মদিন। ৬৪ বছরে পা দেওয়ার কথা ছিল তার। জীবনে তিনি যত গিটার বাজিয়েছেন, যত গান গেয়েছেন, তার সবই এখন স্মৃতির অংশ। কিন্তু কোনো মঞ্চে ‘এই রূপালি গিটার’ বেজে উঠলে কিংবা নিঃশব্দ রাতে ‘সেই তুমি’ কানে এলে মনে হয়—আইয়ুব বাচ্চু কোথাও যাননি।
তিনি আছেন তার গিটারের তারে, গানের কথায় এবং কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে। মানুষটি নেই, কিন্তু তার গিটারের সুর এখনো বাজে।


