‘ক্রসফায়ার’ খায়েশ, তোপের মুখে আইজিপি

২০২২ সালে এসপি হিসেবে অবসরে যান তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার তার চাকরি ফিরিয়ে দেয়। এরপর অস্বাভাবিক দ্রুততায় তিনটি পদোন্নতি পেয়ে হয়ে যান পুলিশ প্রধান।

‘ক্রসফায়ার’ খায়েশ, তোপের মুখে আইজিপি
কার্টুন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

‘ক্রসফায়ার’ যে কথা বলে বছরের পর বছর ধরে মানুষকে গুলি করে হত্যার অভিযোগ নিয়ে দেশ বিদেশে তোলপাড় হয়েছে, সেই ধারায় ফিরতে চান পুলিশ প্রধান মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি সরকারের অনুমতির অপেক্ষায়। তবে বাহিনীর সাবেকরা বিস্মিত, বলেছেন, এই অনুমতি তো সরকারও দিতে পারে না।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগের মধ্যে পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা, ব্যর্থতার যে অভিযোগগুলো দিনে দিনে আরও জোরাল হচ্ছে। এর মধ্যে বাহিনীর মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বলেছেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হবে, সরকার যদি অনুমতি দেয়, আমরা সেটাই করব।’

তার এই বক্তব্য এরই মধ্যে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। সুশাসন ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে, এমন সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাকে অপসারণের দাবি জানানো হয়েছে। একে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আইজিপির ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

সোমবার রাজধানীর চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধন করতে গিয়ে কথাগুলো বলেন পুলিশ প্রধান।

অপরাধ দমনে দৃশ্যত আইজিপি অসহায় অবস্থায় আছেন। তিনি বলেছেন, ‘পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে এক পক্ষ পুলিশকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে।‘

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে সহযোগিতা করা এবং গুজব ও মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত না হয়ে প্রকৃত ঘটনা যাচাই করার আহ্বানও জানান তিনি।

‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন’ বলে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন।’

আইজিপির বক্তব্যের পর বিভিন্ন সংগঠন এবং ব্যক্তিরা মনে করছেন, পুলিশ প্রধান তার দায়িত্ব পালন করতে সাফল্য দেখাতে পারছেন না। এ কারণে তিনি ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন।

বাংলাদেশে এই শব্দটি ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরেই পরিচিতি পায়। পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে যাওয়া শুরু করে, পরে সংবাদ মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হতে থাকে, যার ভাষাগুলো মোটামুটি সব ক্ষেত্রেই একই রকম ছিল।

সেসব বিজ্ঞপ্তিতে লেখা থাকত, অভিযানের একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে পুলিশ পাল্টা গুলি চালায়। এর মধ্যে ক্রসফায়ারে পড়ে যাকে নিয়ে অভিযান, তিনি মারা যেতেন।

কোনো অভিযানের পর প্রায় অকেজো অস্ত্র উদ্ধারের কথা লেখা থাকত, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আহত হওয়ার কথা লেখা থাকত।

সে সময়ের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ক্রসফায়ারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখলেও দলটি ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ধারা চালু রাখে। তবে ক্রসফায়ার নিয়ে তুমুল সমালোচনা হতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ, ইত্যাদি নানা শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করে।

দেশ বিদেশের মানবাধিকার সংস্থা এবং প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ এভাবে বিচারবহির্ভুত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ ও নিন্দা জানাতে থাকে। বিএনপি বিরোধীদলে থাকার সময় তারাও ক্ষমতায় আসলে এভাবে হত্যা বন্ধ করার অঙ্গীকার করে।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে এভাবে ক্রসফায়ারের নামে বিচারবহির্ভুত হত্যা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরের পরিস্থিতি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১৪ মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তাদের মধ্যে ১৯ জন গুলিতে নিহত হন।

অবশ্য গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এমন ঘটনা সামনে আসেনি বললেই চলে।

আরও পড়ুন

‘এটা একেবারেই অসম্ভব’

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বিশ্বাসই করতে পারেননি কোনো পুলিশ প্রধানের পক্ষে ক্রসফায়ার নিয়ে এমন কথা বলা সম্ভব।

তিনি টাইমসকে বলেন, “একজন আইজিপি এ ধরনের কথা বলতে পারেন বলে আমার মনে হয় না।”

পরে আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদের লিংক পাঠানো হলে সাবেক পুলিশ প্রধান বলেন, “তিনি কীভাবে এমন কথা বলতে পারেন, সেটাই আমার বোধগম্য হচ্ছে না। প্রথমত সরকার এটার অনুমতি দিতে পারে না, এবং তা দিলেও পুলিশ তা করতে পারে না। এটা একেবারেই অসম্ভব।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ টাইমসকে বলেন, “তার (আইজিপি) বক্তব্য হওয়া উচিত ছিল—সরকার ক্রসফায়ারের অনুমতি দিলেও পুলিশ তা করবে না। ক্রসফায়ারের কথা বলে আইজিপি আইনের পরিপন্থী অবস্থান নিয়েছেন।”

আলী হোসেন ফকিরের পুলিশের সর্বোচ্চ পদ পাওয়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে একটি অসম্ভব কল্পনা ছিল।

১৯৯৫ সালে নিয়োগ পাওয়া এই কর্মকর্তাকে ২০২২ সালের নভেম্বরে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় তিনি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) ৩ নম্বর ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন, পদমর্যাদা ছিল পুলিশ সুপার।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপর অন্তর্বর্তী সরকার এসে তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে অস্বাভাবিক দ্রুততায় তিনি তিনটি পদোন্নতি পেয়ে যান।

২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট আলী হোসেন ফকিরকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এক বছর যেতে না যেতেই ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট আরেক পদোন্নতি পেয়ে হন অতিরিক্ত আইজিপি। ছয় মাস পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি তাকে আইজিপি পদে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন আসে।

সব অতিরিক্ত আইজিপি যে পুলিশ প্রধান হন, বিষয়টি এমন নয়। সরকার যাকে আস্থাভাজন মনে করে, তাকেই পুলিশের সর্বোচ্চ পদ দিয়ে থাকে। আলী হোসেনের অবসরের সম্ভাব্য তারিখ ২০২৭ সালের ৫ এপ্রিল।

অপসারণ দাবি

আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে। তার কাছে এমন বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবিও করা হয়েছে।

সংস্থাটির আশঙ্কা, পুলিশ প্রধানের বক্তব্য মাঠপর্যায়ে বেআইনি বলপ্রয়োগের প্রচ্ছন্ন ছাড়পত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সরকারের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে এ বক্তব্যের অসংগতি থাকলে তার ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করে তারা।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বিবৃতিতে বলেন, ‘কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না।’

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, আইজিপির এই বক্তব্যের বিষয়ে সরকারের অবিলম্বে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যার কোনো ধরনের অনুমোদন বা প্রশ্রয় দেওয়া হবে না-এ মর্মে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান ঘোষণার দাবিও জানিয়েছে।

এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই।’

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলেছে, ‘অপরাধীর বিচার আদালতেই হতে হবে। রাষ্ট্রীয় অনুমোদন থাকলেও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো সুযোগ নেই।’

সংসদে প্রধান বিরোধী দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকার আইজিপির বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে বলে তার দল আশা করে।

তিনি বলেন, ‘এ বক্তব্য দেশে ভয়ের সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।’

রাজধানীতে এক গণসংযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘অন্য কোনো দেশে এমন বক্তব্য দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর আইজিপি পদে থাকতে পারতেন না।’

আইজিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার পথে হাঁটছে বলে এনসিপি ধরে নেবে বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত।

তীব্র সমালোচনার মুখে পুলিশ সদরদপ্তর অবশ্য এক ব্যাখ্যায় বলেছে, ‘আইজিপি আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ক্রসফায়ার শব্দটি রূপক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে ক্রসফায়ার শব্দটি উল্লেখ করেননি।’

সংবাদকর্মীদেরও আক্রমণ, তীব্র প্রতিক্রিয়া

আইজিপি যে আয়োজনে ক্রসফায়ারের কথা বলেছেন, সেখানে সংবাদকর্মীদের বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ আনেন। বলেন, কিছু সাংবাদিক মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ নেয়।

তিনি বলেন, ‘সমাজে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললেও কিছু সাংবাদিক সেসব বিষয়ে নীরব থাকেন। সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে অর্থ না পেলে তারা পুলিশের অকার্যকারিতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন।’

‘সাংবাদিক সাহেবরা যখন ওখান থেকে পয়সা না পাচ্ছেন, তখন লিখছেন—বাংলাদেশে পুলিশ অকার্যকর হয়ে গেছে,’ বলেন তিনি।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউ এই বক্তব্যকে ‘আপত্তিকর’ আখ্যা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেটি প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি এসেছে।

সংগঠনটির সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বিবৃতিতে বলেন, ‘সাংবাদিকদের পেশাদারিত্ব ও সততা নিয়ে এ ধরনের ঢালাও মন্তব্য স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad