হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পে ৮ হাজার ৪৪১ কোটি টাকার দুর্নীতির সিদ্ধান্তগুলো যাদের উদ্যোগ, স্বাক্ষর ও সমর্থনে বাস্তবায়িত হয়েছিল তাদের এখনো জবাবদিহির আওতায় আনেনি সরকার।
প্রায় সাত হাজার পৃষ্ঠার চুক্তি, আদেশ, বিল, চিঠি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও আপস-মীমাংসার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিতর্কিত প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক পরামর্শক ও ঠিকাদারের প্রতিনিধিদের নথিভুক্ত ভূমিকা রয়েছে। অথচ কারও বিরুদ্ধে স্বাধীন প্রশাসনিক বা ফৌজদারি তদন্ত শুরু না করে অনিয়মকে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দিতে উঠেপড়ে লেগেছে বর্তমান সরকারের ভেতরের একটি চক্র।
টার্মিনালটির প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার পরিচলনা ও নিরাপত্তার কাজটি বাগিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে বিগত দুটি সরকারের লুটপাটকে এড়িয়ে যাচ্ছে তারা।
টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রকল্পের অর্থায়নকারী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানকেই কাজ দিতে বলেছে। এর প্রেক্ষিতে জাপানি মিতসুবিশি করপোরেশন পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটিকে চিঠি দিয়ে প্রস্তাব দেয়। এ নিয়ে তারা তিনটি প্রেজেন্টেশন দিলেও অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রস্তাব বাতিল করে বেবিচক।
পরে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই ও নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করে আগামী ১৫ বছরের জন্য টার্মিনাল পরিচলনায় আগ্রহপত্র জমা দেয়। এর মধ্যে নিপ্পন কোয়েই তৃতীয় টার্মিনালে সংঘটিত অনিয়মের অন্যতম হোতা।
এই কনসোর্টিয়ামটি আয় থেকে মাত্র ২২ দশমিক ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অর্থাৎ এই প্রকল্পের ১৬ হাজার কোটি টাকার ঋণের দায় বাংলাদেশের ওপর চাপলেও আয় পাবে এক পঞ্চমাংশ। অথচ বেবিচক নিজে পরিচালনা করলে আরও বেশি আয় করার সুযোগ ছিল বলে মনে করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। কারণ, প্রকল্পের শুরুতেই বেবিচকের জনবল দ্বিগুণ করা হয়েছিল টার্মিনাল পরিচালনা লক্ষ্যে।
এরপরও জাপানি কনসোর্টিয়ামকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পথে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে নিজেরা লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে সরকারের ভেতরের ওই চক্রটি। যে কারণে লুটপাটে জড়িতদের থেকে জবাবদিহি আদায় করছে না বিএনপি সরকার। অথচ এই প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতে কার কতটা দায় সেটি নথিতে স্পষ্ট।
প্রথমে ঠিকাদার নির্বাচন ও চুক্তি, পরে কাজ ও বিল প্রত্যয়ন, সবশেষে বিরোধ নিষ্পত্তির নামে তছরুপকৃত রাষ্ট্রীয় অর্থকে প্রকল্পের বৈধ খরচে রূপান্তরের চেষ্টা–সবই ঘটেছে এই প্রকল্পের শুরুতে তৈরি করা নীলনকশা অনুযায়ী।
নথি বলছে, এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৭ সালে প্রকল্পটির মূল ঋণ চুক্তি, পরামর্শক নিয়োগ ও একনেক অনুমোদনসহ মৌলিক কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছিল আর একনেক সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা এটির অনুমোদন করেছিলেন। এ সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী ছিলেন রাশেদ খান মেনন।
২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারির মধ্যে এই প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর, সফট ওপেনিং ও ঠিকাদারকে কাজ বুঝে নেওয়ার সনদ (টিওসি) প্রদানের কাজ হয়। এ সময়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী ছিল না। প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মাহবুব আলী। অর্থাৎ এই মন্ত্রণালয়ে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল শেখ হাসিনার হাতে। এরপর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত মন্ত্রী ছিলেন ফারুক খান।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়। এই সময়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন। তার আমলে প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ৩ হাজার ২৬৭ কোটি টাকার অনিয়মিত ব্যয়কে রাষ্ট্রীয় বৈধতা দিয়েছিল একনেক। ওই একনেকের চেয়ারম্যান ছিলেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় যখন তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের অনিয়মকে বৈধতা দিচ্ছিলেন, তখন নিজের প্রতিষ্ঠান আকিজ বশির এভিয়েশনের লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছিলেন সেখ বশির, যা ছিল স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত।
এ বিষয়ে সেখ বশির উদ্দিন দাবি করেন, তিনি দায়িত্বে থাকাকালে এভিয়েশন খাতের ‘দুর্বৃত্তদের’ স্বার্থে আঘাত করায় ওই দুবৃত্তরাই তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
‘আমার এভিয়েশন লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন এবং দীর্ঘতম। এজন্য কোনো বিশেষ সুবিধা নেইনি’, টাইমসকে বলেন সেখ বশির।
নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়ামের (এডিসি) সঙ্গে মূল নির্মাণচুক্তিতে বেবিচকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মফিদুর রহমান। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি ঠিকাদার নির্বাচন ও চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন। ২০২৪ সালের জুনে যখন তিনি অবসরে যান তখন প্রায় ৯৯ শতাংশ ভৌত কাজ শেষ হয়েছিল এবং ঠিকাদার ১৪ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা বিল নিয়েছিল। অর্থাৎ অধিকাংশ অনিয়ম এই সময়ের মধ্যেই হয়েছিল।
তবুও এই প্রকল্পে লুটপাটের পেছনে নিজের দায় অস্বীকার করেন মফিদুর রহমান। টাইমসকে তিনি বলেন, ‘আমি যখন দায়িত্ব নেই তখন প্রকল্পের সকল শর্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।’ তৎকালীন সরকার জাপানের দেওয়া শর্ত যাচাই ও দর কষাকষি ঠিকভাবে করতে পারেনি বলে উল্লেখ করে নিজের দায় এড়িয়ে যান তিনি। প্রকল্পের মূল সমস্যার জন্য তৎকালীন সরকারকে দায়ী করলেও এর ব্যাখ্যা দেননি মফিদুর।
প্রকল্পটির চুক্তি নিয়ে আলোচনার নথিতে প্রকল্প পরিচালক ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্যসচিব এ কে এম মাকসুদুল ইসলাম, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর স্বাক্ষর রয়েছে। দরপত্র মূল্যায়নে বুয়েটের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমেদ, বেবিচকের তৎকালীন সদস্য মিজানুর রহমান এবং মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোশাররফ হোসেনও যুক্ত ছিলেন।
প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিজের দায় নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন মাকসুদুল ইসলাম।
এই প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সনদ দেন পরামর্শক কনসোর্টিয়ামের প্রজেক্ট ম্যানেজার তোশিও সায়েকি। রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সনদে কোন কাজ সম্পন্ন হয়েছে তা উল্লেখ ছিল না। ওই সনদের ভিত্তিতে ঠিকাদার বিলম্বের দায় থেকে রেহাই পায় এবং জামানতের টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পায়। এতে বাংলাদেশ হারায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
এদিকে, আগের অনিয়মগুলোর স্বাধীন তদন্ত না করে বর্তমান বেবিচক চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে আপস-মীমাংসা কমিটি গঠনের অনুরোধ করেন। তার চিঠিতে বিষয়টিকে ‘অতীব জরুরি’ উল্লেখ করে ঠিকাদারের সঙ্গে সমঝোতা করতে বলা হয়। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাহমুদ সিদ্দিক বেবিচকের দায়িত্ব পান ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। তার আগে ১১ মাস দায়িত্ব পালন করেন আরেক কর্মকর্তা মো. মঞ্জুর কবীর ভূঁইয়া। নথি বলছে, এই দুই জনের দায়িত্বকালীন দুই বছরে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের ভৌত কাজ এগিয়েছে মাত্র দশমিক ৯১ শতাংশ।
২০২৬ সালের এপ্রিলে গঠিত আপস-মীমাংসা কমিটি আহ্বায়কের দায়িত্ব পান বেবিচক সদস্য এসএম লাবলুর রহমান এবং সদস্যসচিব হন বর্তমান প্রকল্প পরিচালক এএইচ এমডি নুরউদ্দীন চৌধুরী। সদস্য ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফারুক আহমেদ, বেবিচকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী জাকারিয়া হোসেন, প্রকল্পের টপ সুপারভিশন টিমের মো. শামসুল হক ও হারুন-অর-রশীদ। ঠিকাদার ও পরমর্শক প্রতিষ্ঠানেরও দুইজন করে ছিলেন কমিটিতে।
অর্থাৎ যাদের হাত দিয়েই এই প্রকল্পের অনিয়মগুলো হয়েছে তারাই বসে আপস-মীমাংসা করেছেন।
কমিটি ঠিকাদারকে আরও প্রায় ১ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা দেওয়ার সুপারিশ করে এবং জামানত ছাড়করন, চুক্তি সংশোধন ও চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে।
অথচ এই কমিটি তাদের প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে, তারা কোনো স্বাধীন ফরেনসিক নিরীক্ষা বা তদন্ত করেনি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে পরামর্শকের মূল্যায়ন, ঠিকাদারের তথ্য, ডিসপিউট বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং বেবিচকের অবস্থানের ভিত্তিতে।
বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নুরউদ্দিন চৌধুরী আগে প্রজেক্ট ম্যানেজার, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও উপ-প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অতীতের অনিয়ম ধামাচাপা দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
নুরউদ্দিন চৌধুরী তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। আর বেবিচক চেয়ারম্যান মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিকের সঙ্গে তিন দফা যোগাযোগ হলেও প্রকল্পের অনিয়ম সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সময়ক্ষেপন করেছেন। পাশাপাশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জেভি, ঠিকাদার এডিসি ও জাইকা মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এদিকে, টাইমসের অনুসন্ধানে উঠে আসে, ঠিকাদারের সঙ্গে বেবিচক যেই চুক্তি করেছিল সেটির আওতায়ই ৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত নিয়েছে ঠিকাদার।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষা বলছে, অনুমোদন ছাড়াই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ এবং প্রকল্প পরিচালকের অনুমোদনে ঠিকাদারকে হাজার হাজার কোটি টাকা বেশি দিয়েছে বেবিচক।
২০২৫ সালের জুনে হওয়া ওই নিরীক্ষায় প্রকল্প পরিচালকসহ বেবিচকের দায়ী ব্যক্তি ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বিএনপি সরকার–কেউ এই পরমর্শ আমলে নেয়নি।
এ প্রসঙ্গে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা আগের সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, ‘আমাদের সরকার দায়ীদের চিহ্নিত করবে। আমরা বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখছি।’
তবে দায়ীদের চিহ্নিত করতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। অথচ কোন সিদ্ধান্তে কে সই করেছেন এবং কে অনুমোদন দিয়েছেন, তা সরকারি নথিতেই স্পষ্ট। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, জেনেশুনে ঠিকাদারকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা দেওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি ঠিকাদারি ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সরকারি কাজে নিষিদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে।


