যশোরের ফাহিম হোসেনের কানে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা। স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে বারবার ঢাকায় ছুটতে হয়েছে।
প্রতিবার যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচে পকেট থেকে বের হয়ে গেছে হাজার হাজার টাকা। তার ওপর রাজধানীতে এসে হাসপাতালের শয্যা সংকটসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে তাকে।
একই অভিজ্ঞতা নোয়াখালীর সোহান মাহমুদের। তার ভাইয়ের হাত ভেঙে গেলে নেওয়া হয় স্থানীয় জেলা হাসপাতালে। কিন্তু চিকিৎসক সংকট ও অপারেশন থিয়েটার বন্ধ থাকায় চিকিৎসার জন্য অনেক দিন পরের তারিখ দেওয়া হয়। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স ডেকে ওই রাতেই তারা ছোটেন ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে।
অথচ রোগীদের ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবেই উন্নত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে ২০১৮ সালে যশোর, কক্সবাজার, পাবনা ও নোয়াখালীতে ৫০০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার।
এই প্রকল্প ২০২১ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছরে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। এখন মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরের প্রকল্প শেষ হতে সময় লাগছে এক দশক। সেই সঙ্গে খরচও বাড়ছে অতিরিক্ত ৫৫৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
একই দশা আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্পের। তিন বছরে শেষ করার এ প্রকল্প ২০১৯ সালে শুরু হলেও ইতিমধ্যে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার বিস্তার আটকে রয়েছে।
একইভাবে আটটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের সুবিধা আধুনিক করার একটি প্রকল্প ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ৭৪ শতাংশ। ফলে শুরুর প্রায় এক দশক পরও কাজ অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে।
অর্থ ব্যবহারের নাজুক চিত্র
প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের চিত্রও হতাশাজনক। আইএমইডির তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ১৯টি প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দ ছিল তিন হাজার ১২৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। কিন্তু খরচ করা গেছে মাত্র ৯৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ ১৬টি প্রকল্পের বিপরীতে এক হাজার ৩৮৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা পেলেও খরচ করেছে ৫১০ কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।
দুই বিভাগ মিলিয়ে ৩৫টি প্রকল্পে চার হাজার ৫১৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দের মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র এক হাজার ৪৮৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সামগ্রিক বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে। বরাদ্দের প্রায় ৬৬ শতাংশ টাকাই অলস পড়ে ছিল।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে অবস্থা ছিল আরও নাজুক। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার নেমে দাঁড়ায় ১৯ দশমিক ৮৭ শতাংশে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার ছিল ২১ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের ১৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এই ব্যর্থতার জন্য ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সরকার পরিবর্তনের পর তৈরি হওয়া প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতাকে দায়ী করেন। এ সময় অনেক প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার আত্মগোপন করায় কাজ থমকে যায়। এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যস্ততাও প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি কমিয়ে দেয়।
আগের বছরগুলোতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হার কিছুটা ভালো হলেও তা সন্তোষজনক ছিল না। যেমন—২০২৩-২৪ সালে বাস্তবায়নের হার ছিল প্রায় ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, ২০২২-২৩ সালে ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ২০২১-২২ সালে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
প্রকল্পের এই ঢিমেতালের পেছনে আইএমইডি ও প্রকল্প পরিচালকেরা কিছু মূল সমস্যা চিহ্নিত করেছেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার ঘাটতি, ঠিকাদারদের ঢিলেঢালা ভাব, জমি অধিগ্রহণে দেরি, অর্থ ছাড়ে জটিলতা, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, হুটহাট নকশা বদলানো, কেনাকাটায় ঝামেলা, বারবার দরপত্র আহ্বান, সরকারি আপত্তি ও বারবার প্রকল্প পরিচালক বদলে যাওয়া।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও আইএমইডির সাবেক সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী জানান, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জমি অধিগ্রহণে দেরিই প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল বাধা। অনেক সময় সরকারি অর্থ সংস্থান নিশ্চিত না করেই প্রকল্প শুরু করা হতো। শুরু থেকেই এডিপির বাস্তবায়ন কঠোরভাবে তদারকি করা এবং প্রতি মাসের পর্যালোচনায় সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা মূলত তিনটি-কাঠামোগত, প্রশাসনিক ও আচরণগত।
তিনি জানান, সাধারণ সরকারি সেবার তুলনায় স্বাস্থ্য খাত অনেক জটিল। কারণ, এখানে ভবন নির্মাণ, প্রযুক্তি, কেনাকাটা, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল জড়িত। অথচ একে অন্যান্য সাধারণ সরকারি কাজের একই কাঠামোতে পরিচালনা করা হয়।
এ ছাড়া অভিজ্ঞতার তোয়াক্কা না করে হুটহাট প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। যেমন—হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালকের দরকার নির্মাণকাজ, কেনাকাটা ও সরকারি আর্থিক বিধিমালার স্পষ্ট জ্ঞান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে মাত্র দুই বছর চাকরির মেয়াদ থাকা কর্মকর্তাকে বসানো হয়। ফলে মাঝপথে পরিচালক বদলাতে হয়। এতে কাজের গতি ও ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।
অধ্যাপক হামিদের মতে, এসব সংকট নতুন নয়। শুধু প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, এর জন্য প্রয়োজন প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরনের মৌলিক সংস্কার।


