রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতনের নয় বছর পরেও ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বোঝা বইছে বাংলাদেশ। কক্সবাজারের উপচে পড়া ক্যাম্পগুলোতে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন এসব রোহিঙ্গা। দিন দিন বিদেশি সাহায্য কমে যাওয়া, মারাত্মক অপরাধ, পাচারকারী চক্রের হাতছানি এবং সাগরে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছেন তারা।
২০১৭ সালের আগস্টে প্রায় সাত লাখ মানুষের দেশ ছেড়ে পালানোর মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংকট এখন আরও করুণ ও ঝুঁকিপূর্ণ রূপ নিয়েছে। একদিকে সাহায্য ও কাজের সুযোগ কমছে। অন্যদিকে, মৌলিক সেবাগুলোও সীমিত করা হচ্ছে। যার ফলে দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে এই বিশাল সংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের ওপর চাপ এখন চরমে পৌঁছেছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গাদের জন্য ৭১ কোটি ৫০ লাখ ডলার সহায়তা দরকার। জুনের শুরু পর্যন্ত এর ৬০ শতাংশ পাওয়া গেছে। এই সহায়তার আবেদনই আগের বছরের চেয়ে ২৬ শতাংশ কম ছিল।
ক্যাম্পের ভেতরে এখন খাবার কম দেওয়া হচ্ছে, কাজের সুযোগ প্রায় নেই, পড়াশোনার কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে এবং দিন দিন অশান্তি বাড়ছে। জাতিসংঘ সতর্ক করে বলছে, সাহায্য কমা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গার অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, সাহায্য কমে গেলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষা কর্মসূচি ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর খারাপ প্রভাব কেবল রোহিঙ্গাদের ওপরই নয়, স্থানীয় মানুষ এবং পুরো অঞ্চলের শান্তিশৃঙ্খলার ওপরও পড়বে।
অর্থ সংকট ও বেঁচে থাকার লড়াই
যেহেতু রোহিঙ্গাদের আইনগতভাবে কোনো কাজ করার সুযোগ নেই, তাই সাহায্য কমে যাওয়া সরাসরি তাদের বেচে থাকার ওপর আঘাত হানছে। ২ নম্বর ক্যাম্পের মজিবুর রহমান জানান, আগে তারা মাসে মাথাপিছু ১২ ডলার পেতেন, কিন্তু এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৭ ডলারে। এই সামান্য টাকায় পুরো মাস চলা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ছাড়া ক্যাম্পের ড্রেনগুলো আটকে আছে, হাঁটার সেতুগুলো ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে। সেগুলো মেরামতের কোনো টাকা নেই।
২০২৬ সালে বিভিন্ন সেবার জন্য ৭১ কোটি ৫০ লাখ ডলার চাওয়া হলেও মে মাসের শুরুতে তার একটি অংশ মাত্র পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি সাহায্য কমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যাদের তহবিল ২০২৪ সালের ৩০ কোটি ডলার থেকে কমে ২০২৫ সালের জুনে মাত্র এক কোটি ২০ লাখ ডলারে এসে ঠেকেছে।
স্থানীয় এনজিও ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ওয়াইপিএসএ)-এর কর্মকর্তা যীশু বড়ুয়া জানান, আগে রাস্তা বা পাহাড় সংস্কারে যেখানে ৩০-৪০ জন কাজ পেত, সাহায্য না থাকায় এখন মাত্র ৭-৮ জন কাজ করতে পারছে। ইউনিসেফও টাকার অভাবে বহু স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো কাজ, শিক্ষা বা চলাফেরার স্বাধীনতা না থাকায় তরুণদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।
সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, দুনিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই জায়গাটিতে টিকে থাকার জন্য বহু পরিবার বাধ্য হয়ে মারাত্মক সব ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে। এই সংকটে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ১০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করে ফেলেছে, যা আর টানা সম্ভব হচ্ছে না।
গাদাগাদি ক্যাম্প, অপরাধ ও পাচার
গাদাগাদি পরিবেশ, চরম দারিদ্র্য এবং কাজ না থাকার সুযোগ নিয়ে ক্যাম্পগুলোতে নানা অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবপাচার।
মজিবুর রহমান জানান, প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন রোহিঙ্গা পাচারের শিকার হয়ে ক্যাম্প ছাড়ছে। দালালরা এখন মোবাইলেই তাদের কাজ বা বিয়ের প্রলোভন দেখাচ্ছে। কাজের আশা বা বিয়ের প্রলোভনে পড়ে বহু নারী ও তরুণ এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন।
২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় গিয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়া অনেকেই ভয়ে মুখ খোলেননি। এ ছাড়া জাতিসংঘের ভুয়া কার্ড দেওয়ার কথা বলেও তরুণদের ভুল বোঝানো হচ্ছে।
অপহরণের ঘটনাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। টেকনাফের বাহারছড়া ও ২৪-২৭ নম্বর ক্যাম্পের আশেপাশের এলাকাগুলোয় সন্ধ্যার পর অপহরণ বেশি হয়। যুবনেতা মোহাম্মদ ইমরান জানান, চেকপোস্ট এড়িয়ে ভেতরের গলি দিয়ে অপহরণের কাজ চলছে। পরিস্থিতি সামলাতে রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা কারাগার বানানোর চিন্তাভাবনাও করছে প্রশাসন।
ইয়াবা ও অপরাধমূলক অর্থনীতি
দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে রোহিঙ্গাদের মাদক কারবারে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। সীমান্ত পাহারা কড়াকড়ি হওয়ায় পাচারকারীরা এখন ব্যবহার করছে সমুদ্রপথ।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সোমেন মন্ডল জানান, বাংলাদেশ থেকে মালামাল নিয়ে মিয়ানমারে যাওয়া নৌকাগুলো ফেরার সময় ইয়াবা নিয়ে আসছে। কুতুপালং ও বালুখালীর ছোট ছোট ঘরে ইয়াবা জমা করা হয়। এমনকি শিশুদের ব্যবহার করেও চেকপোস্টে ইয়াবা পারাপার করানো হচ্ছে। বেঁচে থাকার কোনো উপায় না পেয়েই সাধারণ রোহিঙ্গারা বাধ্য হয়ে এসব অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সাগরযাত্রা
ক্যাম্পের করুণ অবস্থা থেকে বাঁচতে বহু রোহিঙ্গা কাঠের নৌকায় চড়ে সাগরে ভেসে পড়ছেন। দালালরা তাদের মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখালেও সেই যাত্রা প্রায়ই মৃত্যু বা চরম নির্যাতনে শেষ হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এক হিসাবে ২০২৫ সালে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সাগরে পাড়ি জমায় এবং আটশরও বেশি মানুষ মারা যান। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই প্রায় তিন হাজার মানুষ সাগরে নেমেছেন, যার মধ্যে বড় অংশই নারী ও শিশু। নয় বছর ধরে বন্দি জীবন কাটানো এই মানুষেরা জীবনের শেষ চেষ্টা হিসেবে সাগরের ঝুঁকি নিচ্ছেন। কিন্তু জরাজীর্ণ নৌকা এবং পাচারকারীদের শোষণের কারণে অনেকেই মাঝপথেই প্রাণ হারাচ্ছেন। এই পথচলা প্রমাণ করে, তাদের জন্য কোনো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
বোঝা বহনে বাংলাদেশের অক্ষমতা
রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পার হলেও কোনো স্থায়ী সমাধানের আশা দেখা যাচ্ছে না। সাহায্য কমলেও মানুষ বাড়ছে, ক্যাম্পের পরিবেশ খারাপ হচ্ছে এবং দারিদ্র্যের সুযোগে অপরাধ বাড়ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও একা এই বিশাল বোঝা টেনে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, এভাবে সাহায্য কমতে থাকলে মানবিক সংকটটি যে কোনো সময় বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে। রোহিঙ্গাদের কোনো দেশ নেই, তাদের ফিরে যাওয়ার নিরাপদ জায়গাও নেই।
জাতিসংঘের মুখপাত্র বাবর বলোচ বলেছেন, সাগরে মানুষের এই মৃত্যু বন্ধ করতে বিশ্ববাসীকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে। গণহত্যার নয় বছর পর রোহিঙ্গাদের সামনে এখন দুটি মাত্র পথ খোলা–ক্যাম্পে ধুঁকে ধুঁকে মরা অথবা সাগরে ভেসে প্রাণ হারানো।


