দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট ও রেকর্ড লোডশেডিংয়ের নেপথ্যে অন্যতম বড় কারণ হতে পারে গত অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত। খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাতিল করা ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র যদি যথাসময়ে চালু করা যেত, তবে দেশের তিন হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ ঘাটতির অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব হতো।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র (টেন্ডার) ছাড়াই এসব সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রাথমিক সম্মতিপত্র (লেটার অব কনসেন্ট) দিয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পগুলো বাতিল করে। এর মধ্যে ৩১টি ছিল বেসরকারি খাতের, যেগুলোর মোট উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট। এই সক্ষমতাটি বর্তমান বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রায় সমান। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের সিংহভাগই ২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসার কথা ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রকল্পগুলো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম দামে পুনরায় অনুমোদন করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা ছাড়ার আগে তারা মাত্র ১২টি প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম অনুমোদন করতে পেরেছিল। ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় দেড় বছর সময় নষ্ট হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদ ৯১৮ মেগাওয়াটের ১২টি প্রকল্পের বিদ্যুতের দাম অনুমোদন করে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পাবনা, নোয়াখালী, মৌলভীবাজারসহ কয়েকটি জেলার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল। তৎকালীন উপদেষ্টা জানিয়েছিলেন, নতুন দামে বিদ্যুৎ কিনলে সরকারের বছরে ৪২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কিন্তু দাম কমানো হলেও শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রগুলো চালুর চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারেনি ওই সরকার।
পরবর্তীতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্বরাজনীতির কারণে জ্বালানি সংকটে নতুন মাত্রা যোগ হয়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায় এবং কাতারে হামলার পর এলএনজি আমদানি স্থগিত হয়ে পড়ে। এতে দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি রেকর্ড ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে গিয়ে পৌঁছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হলেও পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনায় সরকার চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়াটা অবহেলার নামান্তর।
একইভাবে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) সতর্ক করে বলেছিল, এভাবে হুট করে চুক্তি বাতিলের ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়েছে। এই খাতে ১৪টি দেশ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ আসার কথা ছিল। ইতোমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে জমিও কিনেছিল।
সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান জানান, প্রকল্প বাতিল করার আগে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের বক্তব্য বা ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে বাতিল হওয়া ৩১টি প্রকল্প পুনর্বিবেচনার জন্য একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। তবে কমিটি জানায়, পুরোনো আইনি কাঠামো ও বাতিলের আদেশের কারণে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু করার কোনো সুযোগ নেই।
বিদ্যুৎ বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি শাখার অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজা জানান, সরকার এখন একদম নতুন করে এলাকাভিত্তিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করছে। সবচেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রস্তাবকারীদেরই কাজ দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে ৪২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১২টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা বিএনপি সরকারের লক্ষ্য। এর অর্ধেক আসবে ভবনের ছাদ বা রুফটপ সোলার ব্যবস্থা থেকে। প্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় এই পদ্ধতির গ্রহণযোগ্যতা এখন দিন দিন বাড়ছে।


