দেশের চলচ্চিত্রকে সরকারিভাবে ‘শিল্প’ ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল। এ ঘোষণার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যথাযথ শিল্প ঘরে উঠেনি। জাজ মাল্টিমিডিয়া ও আলফা-আই ব্যতীত কোনো প্রযোজনা সংস্থাও গড়ে ওঠেনি–যারা নিয়মিত সিনেমা প্রযোজনা করছে।
ঢালিউডের স্বর্ণযুগ যে সময়কে বলা হয়, সে আশি কিংবা নব্বই দশকে এ ইন্ডাস্ট্রিতে একাধিক প্রযোজনা সংস্থা ছিল। যারা কি না পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ন্ত্রণ করত। এর মধ্যে আলমগীর পিকচার্স, এসএস প্রোডাকশন হাউস, মাসুদ কথাচিত্র, জেমস প্রোডাকশনস, রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশন, আনন্দমেলা সিনেমা, অমি বনি কথাচিত্র তো বড় বড় উৎসবগুলোতে সিনেমা মুক্তি দিতে কাড়াকাড়ি করত। অথচ এখন এ ঈদে বা বড় কোনো উৎসবে সিনেমা মানে জাজ বা আলফা আইয়ের সিনেমা। কেন ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন পেশাদার প্রযোজক তৈরি হচ্ছে না?
নতুন অনেক প্রযোজক আসলেও তারা কেউ স্থায়ী হচ্ছে না। এর পিছনে ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমানে এই শিল্পে পুঁজি তোলার মতো কোনো অবস্থা নেই। তারা আরও মনে করেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগ বান্ধব কোনো নীতিমালা না থাকা এবং অবকাঠামো (বিশেষত সিনেমা হল) সংকটের ফলে বিনিয়োগকারীরা চলচ্চিত্র শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
চলচ্চিত্র সংবাদিক মাহফুজুর রহমানের মতে, ‘একসময় প্রচুর সিনেমা হল ছিল, যেখানে কোনো না কোনোভাবে টাকা তোলার একটা ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি সিনেপ্লেক্স চালু থাকলেও বিনিয়োগকারীরা সিনেমা হল নির্মাণে এগিয়ে আসছে না। এর প্রধান কারণ হলো, সরকারের তরফ থেকে সঠিক নীতিমালার অনুপস্থিতি যা বিনিয়োগকারীদের সিনেমা হল তৈরি বা এই শিল্পে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে।’
তিনি জানান, ভারতীয় বিনিয়োগকারীসহ দেশ-বিদেশের অনেকেই আমাদের চলচ্চিত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখালেও সরকারের তরফ থেকে খুব একটা সাড়া পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া তিনি মনে করেন, আগে একজন সিনেমা হল মালিক কিংবা প্রযোজক যে সামাজিক মর্যাদা পেতেন তা বর্তমানে পাচ্ছেন না। এর পিছনে ২০০০ সালের পর চলচ্চিত্রে ‘কাটপিসে’র প্রাদুর্ভাবকে দায়ী করেন তিনি।
তিনি আরও মনে করেন, ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন তারকা তৈরি না হওয়াও নতুন প্রযোজনা সংস্থা গড়ে না উঠার অন্যতম কারণ। মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ভালো গল্প লেখক, ভালো পরিচালক এবং শিল্পী তৈরি করার জন্য যে সামগ্রিক উদ্যোগ দরকার, তা বর্তমানে অনুপস্থিত। একসময় এফডিসি শিল্পী তৈরি করলেও পরে সেই ধারাবাহিকতা থাকেনি। একটা ভালো চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট দরকার আমাদের।’
চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন মনে করেন, আমাদের দেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ঠিকঠাক হল নেই। সেখানে নতুন প্রযোজনা সংস্থা কীভাবে গড়ে উঠবে?
সুমন বলেন, ‘দেখা যাচ্ছে একজন প্রযোজক ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, তিনি আর প্রযোজনা করছেন না। তার দেখাদেখি নতুন যারা বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন, তারা চলে যাচ্ছেন।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলচ্চিত্র নিয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। মনে হয় না কারও দৃষ্টি আছে এ সেক্টর নিয়ে। মার্কেটগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে সিনেপ্লেক্স করতে হবে। অনুদান নামমাত্র না দিয়ে একটা নীতিমালার মাধ্যমে দিতে হবে। সেটা হতে পারে ২০টা সিনেমার জন্য ২০ কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ হিসেবে দেবে সরকার। এফডিসির মাধ্যমে সে সিনেমা মুক্তি দিয়ে সরকার আবার ফিরিয়ে নেবে। এতে করে নতুন প্রযোজক, পরিচালকের পাশাপাশি ভালো সিনেমাও তৈরি হবে।’


