রুপালি পর্দায় প্রথম পা রাখা একটি মেয়ে। মনে ভয়, চোখে বিস্ময়। অচেনা এক জগতে অনিশ্চিত যাত্রা। কিন্তু গল্পটা তাকে টেনে নিয়েছিল। ধীরে ধীরে ভয় ভেঙে জন্ম নিয়েছে এক নতুন অভিনেত্রী। জাইনীন চৌধুরী করিম—‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রধান চরিত্র।
জাইনীন করিমের গল্প শুরু হয় বহু দূরের এক ক্যাম্পাসে। যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথ কলেজে তিনি পড়েছেন ইংরেজি সাহিত্য। সঙ্গে মাইনর করেছেন চলচ্চিত্র বিদ্যায়। সেই বিভাগেরই এক প্রিয় শিক্ষক তাকে পরিচয় করিয়ে দেন পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের সঙ্গে। ঢাকায় ফেরার পর, ই-মেইলের সূত্র ধরে, হয় প্রথম দেখা। সময়টা ২০২৩ সাল।
“তখন পেপারসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের প্রথম কথা হয়। আমি তখন ভীষণ এক্সাইটেড ছিলাম। এর আগে কখনো এমন কোনো কাজের সঙ্গে যুক্ত হইনি”—বলেন জাইনীন।
ধীরে ধীরে তিনি জড়িয়ে পড়েন প্রজেক্টের সঙ্গে। স্ক্রিপ্টের ড্রাফট পড়তেন। প্রোডাকশন মিটিংয়ে অংশ নিতেন। আর্ট ডিপার্টমেন্ট কিংবা কস্টিউম বিভাগের মানুষদের জন্য স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাতেন। এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন সিনেমাটির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
গল্পের প্রতি ভালোবাসা থেকেই একদিন অডিশনে বসেন জাইনীন। রুবাইয়াত হোসেন তাকে বলেছিলেন, চাইলে চেষ্টা করে দেখতে পারেন। প্রথমে কিছুটা দ্বিধা ছিল। অভিনয়ের কোনো পেশাদার অভিজ্ঞতা ছিল না তার। কিন্তু গল্পটি তাকে টেনেছিল গভীরভাবে।
“আমার কাছে এটি খুব কনসেপচুয়ালি একটি বিশেষ ধরনের সিনেমা মনে হয়েছিল। তাই ভাবলাম, চেষ্টা করে দেখি”—বলেন তিনি।
প্রথমে হয় ইন-পার্সন অডিশন। এরপর মাসের পর মাস চলে ভিডিও অডিশনের পালা। বিভিন্ন দৃশ্যে অভিনয় করে ভিডিও পাঠাতে হতো তাকে। কারণ, নির্মাতারা খুঁজছিলেন একজন অপেশাদার অভিনেত্রীকে। অবশেষে অনেক মাস পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত খবর—চরিত্রের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন জাইনীন।
এর আগে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা বলতে ছিল শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নাটক। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে করা সেই কাজে ছিল ছোট্ট একটি চরিত্র। নাট্যকার ডায়ানার সঙ্গে যৌথভাবে লেখা হয়েছিল সেই নাটক। ডায়ানা সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন।
শুটিংয়ের প্রতিটি মুহূর্ত জাইনীন উপভোগ করেছেন প্রাণভরে। ভবিষ্যতের প্রেস কিংবা উৎসবের ভাবনা তখন মাথায় ছিল না তার। শুধু ছিল বর্তমানের অভিজ্ঞতাটুকু।
“শুটিংয়ে আমাকে প্রতিদিন যেতে হয়েছে। কিন্তু কখনোই আমার মনে হয়নি যে আমি শুধু একটি কাজ করছি”—বলেন জাইনীন।
সিনেমার শুটিং তাকে শিখিয়েছে নতুন এক পাঠ। গল্পের ধারাবাহিকতা মেনে সিনেমা তৈরি হয় না—এই সত্য তিনি প্রথম উপলব্ধি করেন সেটেই। লোকেশনের হিসাব মেনে কখনো শেষের দৃশ্য ধারণ হয় আগে, আবার শুরুর দৃশ্য পরে।
একদিন সকালে ছিল এমনই এক দৃশ্য। জাইনীনের মাথায় ঢেলে দেওয়া হয় এক গ্যালন ঠান্ডা দুধ। অদ্ভুত, রূপকধর্মী এক মুহূর্ত। অথচ সেই রাতেই তাকে করতে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির আরেকটি দৃশ্য। একই দিনে সকাল থেকে রাত—দুই বিপরীত আবেগের ভেতর দিয়ে যাত্রা।
“আমি কখনো ভাবিনি আমার জীবনে এমন অভিজ্ঞতা হবে। একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য চরিত্রের ব্যাপ্তি ধরে রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেদিন সেটা বুঝতে পেরেছিলাম”—বলেন জাইনীন।
চরিত্রটি নিয়ে বেশি কিছু বলতে চান না জাইনীন। শুধু জানান, একটি মেয়ের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর তার জীবনে নেমে আসে এক ভৌতিক অভিজ্ঞতা। মূলত এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক নাট্য বা সাইকোলজিক্যাল ড্রামা।
শুটিংয়ের আগে রুবাইয়াত হোসেন তাকে দেখিয়েছেন অসংখ্য সিনেমা। শতাব্দী ওয়াদুদ, সাবেরী আলম, সুনেরাহ কিংবা বাঁধনের মতো অভিজ্ঞ শিল্পীদের পাশে প্রথমে ছিল ভয়। “আমি একেবারেই নতুন, আর তারা প্রত্যেকেই অনেক অভিজ্ঞ। কিন্তু আসলে তারা আমাকে অনেক বেশি সহায়তা দিয়েছেন”—বলেন জাইনীন।
সেটের বাইরেও গড়ে উঠেছিল সম্পর্ক। যোগব্যায়াম, গান, নাচ—কাজের ফাঁকে চলত এসব। বাঁধনের সঙ্গে বসে গল্প, একসঙ্গে ফুচকা খাওয়া—এসব মুহূর্তই জাইনীনের ভয় কাটিয়ে দিয়েছে ধীরে ধীরে।
অভিনয়ের পাশাপাশি জাইনীনের চোখে এখন নতুন স্বপ্ন—চলচ্চিত্র নির্মাণ। এর আগে তিনি মানবাধিকার আইন নিয়েও কাজ করার চেষ্টা করেছিলেন। গণমাধ্যম যোগাযোগ নিয়েও চলছে তার পড়াশোনা। তবে সবচেয়ে বেশি টানছে চলচ্চিত্র নির্মাণ।
আগামী সেপ্টেম্বর থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের একটি প্রোগ্রামে ভর্তি হচ্ছেন জাইনীন। তিন বছরের এই প্রোগ্রাম মূলত মাস্টার অব ফাইন আর্টস বা এমএফএ। চলচ্চিত্র নির্মাণের নানা দিক শেখানো হবে এখানে। “আমি নিজেকে কখনো কোনো একটি ছকের মধ্যে বেঁধে রাখতে চাই না। যেভাবে কাজ আসবে, যেভাবে নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশ করার সুযোগ পাব, সেভাবেই কাজ করতে চাই”—বলেন জাইনীন।
0‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ইতিমধ্যে ইতিহাস গড়েছে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেওয়া বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা এটি। সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন জাইনীন করিমও। তবে তার যাত্রা এখানেই শেষ নয়। ক্যামেরার সামনে থেকে ক্যামেরার পেছনে—নতুন এক অধ্যায়ের অপেক্ষায় তিনি।


