নষ্ট যন্ত্র, করিডোরে রোগী: খুলনা মেডিকেলের করুণ দশা

নষ্ট যন্ত্র, করিডোরে রোগী: খুলনা মেডিকেলের করুণ দশা
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

কম খরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার আশায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। কিন্তু নষ্ট হয়ে পড়ে আছে হাসপাতালের শত শত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা যন্ত্র। ফলে চরম ভোগান্তি সহ্য করে বেশি টাকায় বাইরের বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা।

প্রায় ১৫ বছর আগে হাসপাতালটি ৫০০ শয্যায় বড় করার সময় যেসব যন্ত্র বসানো হয়েছিল, তার মধ্যে অন্তত ৩৫৪টি এখন একদম অকেজো। এর মধ্যে সাধারণ পালস অক্সিমিটার থেকে শুরু করে সিটি স্ক্যান, পোর্টেবল এক্স-রে ও ডায়ালাইসিসের মতো অতি জরুরি সব যন্ত্রপাতি রয়েছে।

হাসপাতালের মোট কতগুলো যন্ত্র আছে, তার সঠিক হিসাব কর্মীরা দিতে না পারলেও ৩৫৪টি যন্ত্র যে নষ্ট–তা নিশ্চিত করেছেন। পরীক্ষা করা ১১৫টি বড় যন্ত্রের মধ্যে ৮৫টি অকেজো। ফলে প্রতিদিনের বিশাল সংখ্যক রোগীর জন্য মাত্র ৩০টি যন্ত্র চালু রয়েছে।

হাসপাতালের ইলেকট্রো-মেডিকেল টেকনিশিয়ানরা জানান, নষ্টের তালিকায় রয়েছে ছয়টির মধ্যে তিনটি ইসিজি মেশিন, ১৬টি ফটোথেরাপি ইউনিটের সবগুলো, দুটি সিটি স্ক্যানারের মধ্যে একটি, একটি ৫০০ এমএ এক্স-রে ও দুটি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন।

এ ছাড়া চারটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি, নয়টি অ্যানাস্থেসিয়া ইউনিট, ২০টি অপারেশন টেবিল, অপারেশন থিয়েটারের ছয়টি বাতি, একটি ডায়ালাইসিস মেশিন, একটি রিপ্রসেসর, ১২টি হৃদরোগের মনিটর এবং তিনটি আইসিইউ বেড পুরোপুরি নষ্ট হয়ে আছে।

অন্যদিকে যেসব যন্ত্র ভালো আছে, সেগুলোর আবার দরকারি জিনিসপত্র নেই। এক্স-রে ফিল্ম শেষ হয়ে যাওয়ায় রেডিওলজি বিভাগের পাঁচটি এক্স-রে মেশিনই বন্ধ থাকে। আর প্যাথলজি বিভাগে কম খরচে হরমোন পরীক্ষার জন্য ২০২০ সালে যে ‘অটো অ্যানালাইজার’ আনা হয়েছিল, সেটিও রিএজেন্টের অভাবে চালুর পর থেকেই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।

হাসপাতালে অত্যাধুনিক দুটি সিটি স্ক্যানার আছে, যা সাধারণত বাইরের দামি ক্লিনিকেও দেখা যায় না। অথচ রোগীরা এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না।

গত ২০ মে হঠাৎ হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আফসোস করে বলেন, ‘খুলনায় ১৮ কোটি টাকার রেডিওথেরাপি মেশিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।’

একই দিন ভোরের দিকে পুরোনো আইসিইউর পাশের এক স্টোররুমে আগুন লেগে তা দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিস এসে এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভালেও ততক্ষণে একজনের মৃত্যু হয় এবং বেশ কিছু মূল্যবান চিকিৎসা-সরঞ্জাম পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

যন্ত্রপাতির এই তীব্র সংকট নিয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক সুজাত আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নষ্ট ও অকেজো যন্ত্রপাতির তালিকা তৈরি করে আমরা প্রতি মাসেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠাই এবং এগুলো দ্রুত মেরামতের অনুরোধ জানাই।’

শয্যার চেয়ে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি

১৯৮৯ সালে ২৫০ শয্যা নিয়ে শুরু হওয়া এই হাসপাতালটি ২০০৮ সালে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে রোগীর চাপ সামলাতে এটি এখন পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজর ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসায় শত শত মানুষকে বারান্দার মেঝে ও সিঁড়িতে শুয়ে থাকতে হয়। ৪০ জনের জন্য তৈরি করা একেকটি ওয়ার্ডে রাখা হচ্ছে ২০০ জনেরও বেশি রোগী।

অনকোলজি (ক্যান্সার) বিভাগে ভর্তি এক রোগীর স্বজন জানান, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে হাসপাতালটি ১ হাজার  শয্যায় উন্নীত করা এবং নতুন ভবন তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সে কাজ এখনো শেষ হয়নি।

এর পাশাপাশি হাসপাতালে রোগীদের মানহীন খাবার দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন। দুর্নীতির অভিযোগও পুরোনো। ‘খুলনা নাগরিক সমাজ’-এর সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার টাইমসকে বলেন, ‘খুলনা মেডিকেলের এই দুর্ভোগ বহু বছরের। আলোচনা অনেক হলেও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।’

হাসপাতালের সঠিক তদারকি ও শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে বাবুল হাওলাদার আরও বলেন, ‘আমরা শুনেছি হাসপাতালের সরকারি ওষুধ নাকি বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। রোগীরা প্রায়ই নোংরা পরিবেশ ও খারাপ খাবারের কথা বলেন। আমরা কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবে কিছুই বদলায় না।’

দালালদের খপ্পরে অসহায় রোগী

হাসপাতালে আসা অসহায় রোগীদের ওপর ভর করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে একদল দালাল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাকিবুর রহমান পায়ের ব্যথার জন্য চিকিৎসা নিতে এলে দালালরা কম খরচের লোভ দেখিয়ে তাকে বাইরের একটি বেসরকারি পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

রোগীদের অভিযোগ, টিকিট কাটার লাইন থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের ভেতর পর্যন্ত সর্বত্র দালালদের আনাগোনা। র‌্যাব ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের অভিযানের পরও এদের থামানো যাচ্ছে না।

বাবুল হাওলাদারের অভিযোগ, হাসপাতালেরই কিছু অসাধু কর্মচারী বেশি পাওয়ার আশায় দালালদের এই কাজে মদদ দিচ্ছে।

এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য হাসপাতালের পরিচালক কাজী মো. আইনুল ইসলামের ফোনে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

পুরো দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসেবার একই চিত্র

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই করুণ দশা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি দেশের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থারই একটি বড় চিত্র।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ২০২৬ সালের জুলাইয়ের এক  গবেষণা বলছে, দেশের ৬৫ শতাংশ হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও গত এক বছরে মাত্র ২৫ শতাংশ হাসপাতাল নিয়মিত তা দিতে পেরেছে। জেলা হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে ৩৩ শতাংশ, উপজেলা হাসপাতালে মাত্র ১৭ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে এই হার ছিল ২৫ শতাংশ।

গবেষণায় দেখা গেছে, সেবায় বিঘ্ন ঘটার প্রধান কারণ অকেজো যন্ত্রপাতি, যা প্রায় ৭৯ শতাংশ ঘটনার জন্য দায়ী। বাকি ১৪ শতাংশ সেবার সমস্যা হয় দরকারি জিনিসের অভাবে এবং ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে দক্ষ লোকবলের অভাব ছিল মূল কারণ।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad