দেশের খরাপ্রবণ উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপেও পানির সরবরাহ কমছে এবং সেচ সুবিধা সংকুচিত হচ্ছে। এর ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিজমি, সুপেয় পানির সরবরাহ এবং কোটি মানুষের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক কোটি মানুষ। নওগাঁ, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫টি উপজেলার ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে সরকার ‘অতি উচ্চ পানিসংকট’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। আরও ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ’ এবং ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মাঝারি’ পানিসংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ নওগাঁর নিয়ামতপুর, পোরশা, পত্নীতলা, ধামইরহাট ও সাপাহার উপজেলায়। এসব এলাকায় ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ ফুট পর্যন্ত গভীর করে নলকূপ বসানোর পরও কোথাও কোথাও পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা এ সংকটের জন্য নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, অনুমোদিত সীমার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি অগভীর ও গভীর নলকূপ স্থাপন করায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি এবং ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির বিকল্প হিসেবে পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, খাল, বিল ও পুকুর পুনঃখনন করতে হবে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে, কম পানি লাগে এমন ফসলের দিকে কৃষিকে নিয়ে যেতে হবে এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কৃষি খাতে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। যে গভীর নলকূপ দিয়ে একসময় ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া যেত, অনেক এলাকায় এখন তা দিয়ে মাত্র ৯০ থেকে ১১০ বিঘা জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষকরা বোরো চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন, কম পানি প্রয়োজন এমন ফসল চাষে ঝুঁকছেন অথবা জমি অনাবাদি রাখছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। কোথাও কোথাও বাসিন্দাদের খাবার পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে।
এই সংকট কয়েক দশকের ধারাবাহিক অবনতির ফল। নিয়ামতপুর, পোরশা, সাপাহার ও ধামইরহাটের কিছু এলাকায় ১৯৯২ সালে মাটির মাত্র ৯০ ফুট গভীরেই ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যেত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নলকূপ আরও গভীরে বসাতে হয়েছে—প্রথমে ১১০ ফুট, পরে ১২০ ফুট পর্যন্ত।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ২৯ দশমিক ০৯ মিটার। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা নেমে হয়েছে ৩১ দশমিক ০৪ মিটার। সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে পানির স্তরের উল্লেখযোগ্য পুনঃভরণও (রিচার্জ) হয়নি।
পোরশার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামের গভীর নলকূপ পরিচালনাকারী সাইফুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবর্তন দেখছেন। শুরুতে তার নলকূপে ৯০ ফুট গভীর থেকে পানি উঠত। পরে নলকূপের গভীরতা বাড়িয়ে ১১০ ফুট এবং এরপর ১২০ ফুট করা হয়।
তিনি বলেন, ‘যেভাবে পানির স্তর নিচে নামছে, তাতে মনে হচ্ছে কিছুদিন পর আর তোলার মতো পানি থাকবে না।’
বাংলাদেশ পানি আইন অনুযায়ী সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে ১০ বছরের জন্য পানিসংকটাপন্ন অঞ্চল ঘোষণা করে ১১টি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। পানীয় জল ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নতুন নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফসলের বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে কৃষির ধরনেও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নওগাঁয় ধান চাষের জমি ২০১৫ সালের ১ লাখ ৯৮ হাজার ৪৬৫ হেক্টর থেকে কমে বর্তমানে ১ লাখ ৯২ হাজার ৫০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে আম চাষের জমি ২০১৬ সালের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টরে হয়েছে। একই সময়ে গম চাষ ২৬ হাজার হেক্টর থেকে কমে ৮ হাজার হেক্টরে নেমে এসেছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) জানিয়েছে, প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সংস্থাটির দাবি, এখনো বোরো উৎপাদন হুমকির মুখে পড়েনি।
বিএমডিএর নওগাঁ অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বলেন, সেচ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতি এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে গভীর নলকূপ বন্ধ করে দিতে হবে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে কর্তৃপক্ষ পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। খাল পুনঃখননের পাশাপাশি মহানন্দা ও পদ্মা নদী থেকে পানি আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা একদিনে কমানো সম্ভব নয়।
খাবার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতেও সরকার কাজ করছে। নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণের জন্য জলবায়ু সহনশীল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জেলায় ২ হাজার ১০৭টি পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটির ধারণক্ষমতা ৩ হাজার লিটার। পাশাপাশি পানি ব্যবহারে কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। কোকা-কোলা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ডাসকো ফাউন্ডেশনের ‘সওয়াব’ (SAWAB) প্রকল্প নিয়ামতপুর ও গোমস্তাপুরের ১৩টি ইউনিয়নে নিরাপদ পানি ব্যবস্থা, পুকুর পুনঃখনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণ নিয়ে কাজ করছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, এরই মধ্যে ৩৪টি কমিউনিটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, চারটি স্কুল ওয়াশ ব্লক, দুটি কমিউনিটি ক্লিনিকে পানি সুবিধা, ২০টি পুকুর পুনঃখনন এবং ১০টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগে প্রায় ৩৮ হাজার ৯৭০ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।
তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, বিচ্ছিন্নভাবে নেওয়া এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নাইস পারভিন পানিসংকট মোকাবিলায় বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, আধুনিক কৃষিপদ্ধতি এবং পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন।
নলকূপগুলো আরও গভীর করা হচ্ছে, সেচের আওতায় আসা জমি কমছে এবং লাখ লাখ মানুষ সরকারি তালিকাভুক্ত পানিসংকটাপন্ন এলাকার মধ্যে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় বরেন্দ্র অঞ্চলের ভবিষ্যৎ রক্ষায় ভূগর্ভস্থ পানি হারিয়ে যাওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ ক্রমেই বাড়ছে।


