সিরাজগঞ্জ-কামারখন্দ আঞ্চলিক সড়ক দিয়ে ছুটে চলার সময় হঠাৎ চোখ আটকে যেতে পারে পুকুরের স্বচ্ছ জলে ভেসে থাকা এক অপরূপ দৃশ্যে। শান্ত জলের বুকজুড়ে যেন প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দৃষ্টিনন্দন একটি দ্বিতল মসজিদ। চারপাশের সবুজ, নির্মল পরিবেশ আর স্থাপত্যের সৌন্দর্য মিলিয়ে মুহূর্তেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্যপট।
এটি সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের ‘মসজিদ-এ-নওয়াজিস’। স্থানীয়দের কাছে এটি বেশি পরিচিত ‘জমিদার বাড়ি মসজিদ’ নামে। ইতিহাসের স্মৃতি, নান্দনিক স্থাপত্য ও ধর্মীয় আবহ–সব মিলিয়ে মসজিদটি এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়, হয়ে উঠেছে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।
প্রায় এক একর আয়তনের স্বচ্ছ জলের পুকুরের পশ্চিম পাড়ে নির্মিত হয়েছে মসজিদটি। মসজিদের সামনের অর্ধচন্দ্রাকৃতির সিঁড়িগুলো নেমে গেছে পানির দিকে, আর বিপরীত পাড়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন আরেকটি সিঁড়ি ও আকর্ষণীয় প্রবেশদ্বার। সকাল কিংবা বিকালের নরম আলোয় যখন শান্ত পানিতে মসজিদের পুরো অবয়ব প্রতিবিম্বিত হয়, তখন তৈরি হয় এক অপার্থিব পরিবেশ। মনে হয়, পানির আয়নায় ভেসে আছে আরেকটি মসজিদ।
মসজিদটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কালিয়া হরিপুরের পুরোনো জমিদারবাড়ির ইতিহাস। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে এ এলাকার জমিদার ছিলেন শ্যাম শঙ্কর মৈত্র। পাকিস্তান আমলে তার বংশধরেরা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ডা. নওশের আলী তালুকদারের কাছে বিক্রি করে ভারতে চলে যান।
পরবর্তীকালে নওশের আলী ও তার উত্তরাধিকারীরা এ সম্পত্তি ভোগদখল করে আসছেন। প্রায় ২৫ বছর আগে তার বড় ছেলে নওয়াজিস আলী পুরোনো জমিদারবাড়ির পুকুরপাড়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। তার নামানুসারেই মসজিদটির নাম রাখা হয় ‘মসজিদ-এ-নওয়াজিস’।
প্রায় দেড় বছর আগ মসজিদটির আধুনিকায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়, যা পুরোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে আধুনিক নান্দনিকতার ছোঁয়া। ২৫০ জন মুসল্লির ধারণক্ষমতার এই মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমার নামাজ আদায় হয়।
মসজিদটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো–এখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোনো দান-অনুদান নেওয়া হয় না। ইমাম মো. তরিকুল ইসলাম ও কেয়ারটেকারসহ সংশ্লিষ্টদের বেতন এবং রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় ব্যয় বহন করে ‘ডা. নওশের আলী তালুকদার ফাউন্ডেশন’।
ফাউন্ডেশনের অন্যতম কর্ণধার জুলফিকার হায়দার লিটন জানান, মসজিদ পরিচালনার পাশাপাশি এলাকায় অসহায় ও প্রবীণদের নিখরচায় চিকিৎসাসেবা দিতে একটি ‘বয়স্ক চিকিৎসালয়’ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁদের।
একসময় শতাধিক মানুষের বসতিতে মুখরিত জমিদারবাড়ির সিংহভাগ হারিয়ে গেলেও অতীতের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে দুটি পুরোনো পাকা দালান, যা সম্প্রতি নতুন রঙে সাজানো হয়েছে। এছাড়া এখানে আসা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে স্থানীয় খামারের সুস্বাদু ও খাঁটি দই।
ইতিহাস, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এমন মেলবন্ধন দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। পুকুরের শান্ত জলে ভেসে থাকা এই নান্দনিক স্থাপনাটি কেবল ইট-পাথরের কোনো কাঠামো নয়, যেন ইতিহাসের বুক থেকে উঠে আসা প্রশান্তির এক জীবন্ত ঠিকানা।


