রাজধানী ঢাকার আদাবর এলাকার বাসিন্দা মারুফ আহমেদের মে মাসের বিদ্যুৎ বিল ছিল তিন হাজার টাকা। জুনে তা প্রায় তিন গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৫০০ টাকা।
অস্বাভাবিক এই বিল নিয়ে কয়েকবার বিদ্যুৎ অফিসে গেছেন মারুফ। সেখানে তাকে মিটার রিডিংয়ের ছবি দেখিয়ে বলা হয়েছে, বিল ঠিকই আছে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে মারুফ বলেন, ‘কীভাবে কী হয়েছে সেটাই বুঝতে পারছি না। সমাধানেরও কোনো সম্ভাবনা দেখছি না, বেশ কয়েকদিন তো আসলাম।’
জুনে বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে জুলাইয়ে যে বিল এসেছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সারা দেশেই। কোথাও কোথাও তিন গুণ, কোথাও বা পাঁচ থেকে সাত গুণ বেশি বিলের অভিযোগ আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক বিল এলে তদন্ত করে সমাধান হবে। কিন্তু গ্রাহকরা জানতেই পারছেন না আদৌ কোনো তদন্ত হচ্ছে কি না।
ম্যূলস্ফীতির কারণে চাপে থাকা গ্রাহকদের মধ্যে অনেকেই বারবার ছুটে যাচ্ছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কার্যালয়ে। সেখানে যাওয়ার পর যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা সন্তুষ্ট করতে পারছে না মারুফের মতো গ্রাহকদের। রাগ ও ক্ষোভের মিশেলে তারা বাসায় ফিরছেন।
ধানমন্ডির বাসিন্দা মো. রফিকের মাসিক বিল সাধারণত এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে থাকে। কিন্তু জুনের বিল এসেছে চার হাজার টাকা। অভিযোগ নিয়ে কয়েক দিন ধরে বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসির কার্যালয়ে ঘুরছেন তিনি।
হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন ঘুরেছি, কিন্তু মনে হচ্ছে না কোনো সমাধান পাব। অভিযোগ জানাতে কোথায় গেলে লাভ হবে সেটাই বুঝতে পারছি না, খালি এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে চক্কর খাচ্ছি।’
গ্রাহকদের কারও অভিযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিলের অঙ্কের কোনো সামঞ্জস্য নেই। কেউ প্রিপেইড মিটার থেকে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বা অস্পষ্ট চার্জ কেটে নেওয়ার অভিযোগ করছেন।
নবীনগরের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, যেখানে তার মাসিক বিল ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে থাকে, সেখানে ৪২ হাজার টাকা বিল আসার পর তিনি দুই মাসে একাধিকবার বিদ্যুৎ অফিসে গিয়েও সমাধান পাননি।
ডিপিডিসির উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে এ বিষয়ে ফোনকলের মাধ্যমে যোগাযোগ করার চেষ্টা সফল হয়নি।
সংস্থাটির ধানমন্ডি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা আগের বছরের একই সময়ের বিলের সঙ্গে বর্তমান বিলের তুলনা করে গ্রাহকদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন, বাড়তি ব্যবহারের কারণেই বিল বেড়েছে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল পাওয়া গেলে বিল সংশোধনও করা হচ্ছে, তবে সেটি খুবই কম।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য গড়পড়তা একই রকম, গরমের সময় বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে অনেক গ্রাহকের বিল বেড়েছে।
তবে জুনে ট্যারিফ বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশের মতো। সেখানে বিদ্যুৎ বিল কেন দ্বিগুণ বা তিনগুণ বা নবীনগরের সেই বাসিন্দার মতো চার গুণ আসবে, সেই ব্যাখ্যা মিলছে না।
কর্মকর্তারা এও বলছেন, অভিযোগ নিয়ে আসা সবার ক্ষেত্রেই বিলিংয়ের ভুল পাওয়া যায় না। তবে মিটার রিডিং বা কারিগরি সমস্যার কারণে কোথাও গরমিল হলে তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ জানাতে হটলাইন, কিন্তু এরপর কী
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অভিযোগ বাড়তে থাকায় গত ২৯ জুন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোকে বিষয়টি যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। অস্বাভাবিক বিল এলে সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থা বা হটলাইনে অভিযোগ জানাতেও বলা হয়।
এরপর ২ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসক ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়ে পর্যালোচনা সভা হয়। সেখানে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ তদন্ত করে দ্রুত নিষ্পত্তি, করনিক বা কারিগরি ভুল হলে তাৎক্ষণিক সংশোধন এবং অসদুপায় প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু গ্রাহকদের অভিযোগ অব্যাহত থাকার মধ্যেই গত ৩ আগস্ট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে একটি স্পষ্টিকরণ জারি করে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিবৃতিতে বলা হয়, কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ‘অপপ্রচার’ চালাচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, ইতোমধ্যে পাওয়া অতিরিক্ত বিলসংক্রান্ত সব অভিযোগ বিভাগ ও বিতরণ সংস্থাগুলো সমাধান করেছে। কোনো গ্রাহকের অভিযোগ থাকলে প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ‘আরও দায়িত্বশীল আচরণ’ করার অনুরোধ করা হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী তো গ্রাহকদের এই অভিযোগ ফুৎকারে উড়িয়েই দিয়েছেন। তিনি সংবাদকর্মীদের প্রশ্নে বলেছেন, ‘যখন আমরা বলি বিলগুলো নিয়ে আসেন, তখন তো বিল নিয়ে আসে না কেউ আমাদের কাছে।’
এক সাংবাদকর্মী ফেসবুকে দ্বিগুণ বিল আসার বিষয়ে লেখালেখি করার পর তার বাসায় লোক পাঠিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার লোক গিয়ে পরীক্ষা করে দেখে এসেছে, উনি দুইটা এয়ার কন্ডিশনড চালান, উনার ফ্রিজ আছে, ব্লেন্ডার চালান, এত কিছু পরেও সাত হাজার টাকা যদি বেশি বিল হয়, আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোথাও সাত হাজার টাকা দিয়ে এত কিছু চালানো যায়।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘গ্রাহক যদি নিশ্চিত থাকেন যে দাম বাড়ার পর তাদের ব্যবহারের ধরনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন আসেনি, তবে বিল বড়জোর ২৫ শতাংশ বা চার ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি পেতে পারে। এর বাইরে বিল আসাটা অস্বাভাবিক।’
সরকারের বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব স্বার্থেই এই ধরনের অসংগতি নিয়ে তদন্ত করা উচিত, বলছেন তিনি।


