বৃক্ষপ্রেমী এক চিকিৎসক দম্পতির উৎসাহে খুলনায় ছাদ বাগান মানুষের শখে পরিণত হচ্ছে।
বিভাগীয় শহরের প্রাণকেন্দ্র আহসান আহমেদ রোডে নিজের দুইতলা বাড়িতে বসবাস করেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আমিরুল খসরু ও তার জীবনসঙ্গিনী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আফরোজা খানম। সেই বাড়ির ছাদকে সবুজে পরিণত করেছেন দুজন।
চিকিৎসক খসরু টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘গাছপালার পরিচর্যা একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, যা মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখে।’
এই দম্পতির সন্তান থাকে ঢাকায়। এই অবস্থায় পেশাগত জীবনের বাকি সময়ের একটি বড় অংশ কাটে গাছের পরিচর্যা করে। তাদের দেখাদেখি এবং উৎসাহে শহরে অন্যান্য বাড়ির ছাদেও গড়ে উঠছে ছাদ বাগান। তিনি এ শখকে পরিশীলিত, শৈল্পিক, অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
ছাদবাগানপ্রেমীদের নিয়ে খুলনায় গড়ে উঠেছে ‘সবুজে হাসি, সবুজে বাঁচি’ নামে একটি সংগঠন, যার প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়কও আমিরুল খসরু। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাছের প্রতি আগ্রহ তৈরি এবং নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতির কাছাকাছি আনা এই সংঠনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
খুলনার লবণচোরা এলাকার তানভীর আহমেদ সজল টাইমসকে বলেন, ‘খসরু ভাই অনেক বছর ধরেই তিলে তিলে ছাদবাগানটি গড়েছেন। এটি একটি জীবন্ত জাদুঘর ও সংগ্রহশালা, ছাদবাগান প্রেমীদের জন্য স্বর্গ। তার সংগ্রহ ও বনসাই গাছ দেখে আমিও উদ্বুদ্ধ হই এমন বাগান করতে, খুলনায় আরও অনেকেই এখন বাগান করছেন। আমি একটু একটু করে বনসাই বানানোর চেষ্টা করছি। আশা করছি, ভবিষ্যতে কিছুটা কাছাকাছি যেতে পারব।’
শহরটির বিভিন্ন বাড়ি ও আবাসিক ভবনেই গড়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দন বাগান। ছোট্ট ছাদের সবুজ এই পরিসরে পরিবারের সঙ্গে বিকেল কাটানো জীবনধারার অংশ হয়ে গেছে।
শুধু মনের খোরক নয়, অনেকে ছাদবাগান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবানও হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। সেখানে ফলছে টমেটো, বেগুন, কাঁচামরিচ থেকে শুরু করে আম, ড্রাগন ফল কিংবা মাল্টার মতো পুষ্টিকর ফল।
ডালিয়া নার্সারির কর্ণধার ও খুলনা নার্সারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু মাসুদ বলেন, ‘খুলনায় ছাদ বাগানিদের সংখ্যা পরিসংখ্যান না থাকলেও তা আগের যে কোনো সময়ের থেকে অনেক বেশি। এর ভবিষ্যত দারুণ সম্ভাবনাময়।’
তার এই যাত্রার শুরু ২০০০ সালে। ২৬ বছর পর সেখানে ১ হাজার ২০০টির মতো গাছ রয়েছে। সংখ্যাটি এতই বেশি যে, সুনির্দিষ্ট সংখ্যাও বলতে পারছেন না। তবে এক সময় গুনতেন। হাজার পার হওয়ার পর গুনা ছেড়েছেন।
এসব গাছের মধ্যে যার অধিকাংশই বনসাই, শোভাবর্ধনকারী, ফুল ও ফলের গাছ। বিরল প্রজাতির গাছও রয়েছে, যা বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়।
উইপিং তেঁতুল, ব্লু বেল, স্মৃতিমালা, আমবট, এলাচ লেবু, সাইপ্রাস বেরি, রুবি লংগান, জাকারাণ্ডা (বাংলাদেশে বেগুনি কৃষ্ণচূড়া হিসেবে প্রচলিত), কলা, ফাইকাস, এডেনিয়াম, বাওবাব বিভিন্ন রঙের বাগানবিলাস, ক্যাকটাস, আমড়া, নানা ধরনের আম, লেবু, কমলা, পেয়ারা, কামরাঙ্গা, ডুমুর, সফেদা, নোয়াল বেদানাসহ অসংখ্য শোভাবর্ধনকারী, ফল ও ফুলের গাছের সমাহার রয়েছে এই ছাদে।
চিকিৎসক খসরু জানান, ২০০০ সালের দিকে ছাদবাগান বা বনসাই সম্পর্কে শেখার তেমন কোনো সহজলভ্য উপকরণই ছিল না এমনকি এ বিষয়ক বই ও পাওয়া যেত কদাচিত। পরে গাছের পরিচর্যা ও বনসাই তৈরির পদ্ধতি তারা নিজেরাই ভুল করতে করতে শিখেছেন।
এই বাগানের প্রায় সব বনসাই গাছ প্রায় ২০ বছর আগে থেকে নিজের হাতে তৈরি। কিছু গাছ তিনি ঢাকা, যশোর ও সিলেট থেকে সংগ্রহ করেছেন, কিছু আনিয়েছেন ভারত থেকে।
ছাদে থাকা প্রায় সব ফুল, ফল শোভাবর্ধনকারী ও শৌখিন গাছই বনসাই, যার অনেকগুলোই বিরল।
এত বিপুল সংখ্যক গাছ কিন্তু বিক্রি করেন না এই দম্পতি। খসরুর ভাষায়, এগুলো তার সন্তানের মতো, তাই নিজের তৃপ্তির জন্য এগুলোর পরিচর্যা করেন। বিভিন্ন সময়ে তার বনসাইয়ের প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় এবং বৃক্ষমেলাতেও সংগ্রহ প্রদর্শিত হয়।
তিনি বলেন, করোনাভাইরাস মহামারীর সময়, লকডাউনের দিনগুলোতে বিষন্ন দিনে এই গাছগুলোই তাকে মানসিক তৃপ্তি দিয়েছে। সে সময় তিনি বাগানের সম্প্রসারণ, নতুন গাছ সংগ্রহ এবং বনসাই তৈরিতে নিরবিচ্ছিন্ন মনোযোগ দেন।
কেবল ছাদে নয় পুরো বাড়িটিও প্রকৃতিবান্ধবভাবে সাজিয়েছেন এই দম্পতি। দোতালার বারান্দা আর সিঁড়িতেও রয়েছে অসংখ্য গাছ। এমনকি তাদের বাড়ির নামও রাখা হয়েছে ‘শেকড়’।
খুলনার বটিয়াঘাটায় এই দম্পতির একটি বাগানবাড়ি রয়েছে। সেখানে আরও বড় পরিসরে ফল, সবজি, শোভাবর্ধনকারী ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছের রোপণ ও পরিচর্যা করা হয়।
ছাদে গাছের এই রাজ্যে দেখা মেলে নানা প্রজাতির পাখিরও। বিভিন্ন গাছের ডালে বাসা বাঁধে মৌটুসি, টুনটুনি, বুলবুলি-সহ বিভিন্ন রঙের দেশীয় পাখি।
এই বাগানের পরিচর্যার জন্য সার্বক্ষণিক একজন কর্মী এবং দুইজন খণ্ডকালীন সাহায্যকারীও কাজ করে।
বিভিন্ন ধরনের মাটির ও সিরামিকের পাত্রের পাশাপাশি নানা আকারের প্লাস্টিক উড ও ইকো উড, সিরামিকস এর বিভিন্ন পাত্র ব্যবহার করে তিনি এই দম্পতি তৈরি করেছেন নান্দনিক ব্যতিক্রমধর্মী বনসাই টব। প্রতিটি টবেই ফুটে উঠেছে তাদের সৃষ্টিশীল, শৈল্পিক চিন্তাধারার সমন্বয়।
চিকিৎসক খসরু দক্ষ পাখি আলোকচিত্রীও। তিনি খুলনা ফটোগ্রাফি সোসাইটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বন্যপ্রাণী আলোকচিত্র সম্বলিত ‘কলরব’ নামে তিনি একটি বই লিখেছেন।


