সোলসের পঞ্চাশ, পার্থ বড়ুয়ার বালাই ষাট!

সোলসের পঞ্চাশ, পার্থ বড়ুয়ার বালাই ষাট!
৬০ বছর বয়সে পা দিলেন ব্যান্ড সংগীতের বিস্ময় পার্থ বড়ুয়া। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যে ক’টি নাম কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে, পার্থ বড়ুয়া তাদের একজন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থীর গানে মিশে আছে প্রেম, প্রতিবাদ আর প্রজন্মের আবেগ। ৩ মে পা দিলেন জীবনের ষাটতম বছরে। তবু তিনি যেন সময়ের সীমা ছাড়িয়ে এক চিরসবুজ অনুভবের নাম।

সোলস—শুধু একটি ব্যান্ড নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’ কিংবা ‘এই মুখরিত জীবনের চলার পথে’—এই গানগুলো শুধু সুর নয়, সময়ের দলিল। এই গানের ভেতর দিয়েই আমাদের চেতনায় গেঁথে আছেন পার্থ বড়ুয়া। এক সময়ের গিটারিস্ট থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন সোলস-এর কণ্ঠস্বর, আত্মা এবং সত্তা।

গিটারিস্ট থেকে পার্থ হয়ে উঠেছেন সোলস-এর কণ্ঠস্বর, আত্মা এবং সত্তা।

১৯৯৫ সালে বিটিভির ‘জলসা’ অনুষ্ঠানে বাঁশির সুরে যার যাত্রা শুরু, সেই সুর আজও শোনা যায় হাজারো কণ্ঠে। শুধু সংগীত নয়, অভিনয়েও রেখেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর—‘আয়নাবাজি’র সাংবাদিক চরিত্র থেকে শুরু করে টেলিভিশনের পর্দায় চট্টগ্রামের গল্পে তার উপস্থাপন, সর্বত্রই তিনি ছুঁয়ে যান হৃদয়ের গভীর তার।

চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর সংগীতযাত্রা নিয়ে স্মরণীয় হয়ে রইল ২ মে রাতে ‘রেডিসন ব্লু বে-ভিউ হোটেলের’ বলরুমে অনুষ্ঠিত বিশেষ কনসার্ট—‘সোলস আনপ্লাগড: ফিফটি ইয়ারস অব টাইমলেস মিউজিক’। ব্যান্ডটির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই আনপ্লাগড পরিবেশনায় ছিল না বাড়তি সাউন্ড ইফেক্ট, ছিল কেবল হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া নিখাদ গান।

মহড়ার সময় পার্থ বড়ুয়ার মেজাজ হারানো, সহশিল্পীদের সঙ্গে রসিকতা, আবার সিগারেট হাতে দর্শকের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা—সব মিলিয়ে যেন এক জীবন্ত উপাখ্যান। সেই সন্ধ্যায় তার কণ্ঠে যখন বেজে উঠল ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’, শ্রোতারা যেন ফিরে গেলেন সময়ের করিডোরে।

সোলস—শুধু একটি ব্যান্ড নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

ব্যক্তিগতভাবে সেই সন্ধ্যার অভিজ্ঞতা ছিল আবেগঘন। পার্থ বড়ুয়ার সঙ্গে কথোপকথনে উঠে এল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সংগীতানুষ্ঠানের সম্ভাবনা, যেখানে তিনি নিজেই আসতে আগ্রহী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তার গানের কনটেন্ট নিয়ে গবেষণাও করেছেন। শিল্পী বিস্মিত হলেন, উচ্ছ্বসিতও।

আরও পড়ুন

এ কনসার্টে একটি নতুন সংযোজন ছিল সেক্সোফোন—যা সোলস-এর সুরে যুক্ত করেছে গভীর আবেগের নতুন মাত্রা। এমন এক ব্যান্ড, যাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে, আজও তাঁদের সুর মানুষের মনে গেঁথে থাকে।

রাত শেষের দিকে। হোটেলের দরজায় পার্থ বড়ুয়াকে বললাম, ‘আরও পঞ্চাশ বছর পর আপনি হয়তো থাকবেন না, কিন্তু সোলস-এর গান ঠিকই থাকবে মানুষের হৃদয়ে।’ শিল্পী তার চিরচেনা হাসি নিয়ে বললেন, ‘অনেক ধন্যবাদ, স্যার।’

১৯৭৩ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু করা এই ব্যান্ড আজ বাংলাদেশেরই সমবয়সী। ‘সোলস’ নামটি শুধু ব্যান্ড নয়—এ যেন আত্মার মিলন। আত্মার টানে বাঁধা আত্মীয়তা, আর সেই আত্মীয়তা গড়ে তুলেছে হাজারো মানুষের হৃদয়ে।

একটি নাম, একটি আত্মা, একটি সময়—সোলস। আর সেই আত্মার সুরস্রষ্টা পার্থ বড়ুয়া। ষাট বছরে পদার্পণে তাকে জানাই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।

শুভ জন্মদিন, শিল্পী।

লেখক: রাজীব নন্দী, শিক্ষক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad