রাজধানীতে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি ভবনে ভাঙচুর, দখল ও লুটপাটের ঘটনায় দেশজুড়ে অরাজকতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিস্ক্রিয়তার ছবি ফুটে ওঠেছে। তিনটি ঘটনাতেই প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে মহড়া দেওয়া হয়েছে, প্রতিটিতেই এসেছে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের নাম।
ঘটনাগুলোর ভয়াবহতা সত্ত্বেও পুলিশের ভূমিকা ছিল চরম নিষ্ক্রিয়। মিরপুরে পাঁচ দশকের পুরনো রাড্ডা ক্লিনিকে এক্সকাভেটর দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে লুটপাটের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশের গাড়ি অবস্থান করলেও তারা কোনো বাধা দেয়নি।
মোহাম্মদপুরে এক বাড়ি দখলের চেষ্টা চলার সময় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ বারবার ফোন করা হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর। অন্যদিকে, সেনানিবাসের কাছে ইসিবি চত্বরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাণ্ডব চালানোর পরও পুলিশ যায়নি। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে উপস্থিত হয়।
তীব্র সমালোচনার মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে অবহেলাকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের এমন হুমকি বারবার এলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতির প্রমাণ মেলেনি।
রাড্ডা ক্লিনিকে তণ্ডব: দিনমজুররা গ্রেপ্তার, মূল হোতারা অধরা
গত বৃহস্পতিবার রাতে মিরপুর-১-এর ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে’ এক্সকাভেটর নিয়ে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। লুট করা হয় ভেতরের কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম। এই ঘটনা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও সমালোচনার ঝড় তুলেছে। হামলার সময় সেখানে পুলিশের গাড়ি উপস্থিত থাকার ভিডিও ইতিমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এই হামলায় বিএনপির স্থানীয় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম এলেও পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি। এমনকি দল থেকেও তার বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ঘটনায় অজ্ঞাতনামা কয়েক শ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হলেও পুলিশ এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে ৮ জনই সাধারণ দিনমজুর বা শ্রমিক।
যে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর নামে রাড্ডায় তাণ্ডব চালানো হয়েছে, সেই সমিতির সভাপতি শাহ আলম গ্রেপ্তার হলেও হামলার প্রধান হোতা হিসেবে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা হানিফ মিয়া এখনো অধরা। অবশ্য দায়িত্বে অবহেলার কারণে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে রোববার দুপুরে রাড্ডার জায়গায় অবৈধভাবে টাঙানো সাইনবোর্ডটি ভেঙে দেয় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা।

৯৯৯-এ কল করেও পুলিশ এল সাড়ে তিন ঘণ্টা পর
রাড্ডার ঘটনার আলোচনা থামতে না থামতেই শনিবার সকালে মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের ‘টুইন টাওয়ারের’ দ্বিতীয় তলায় একটি অফিসে ঢুকে ১৫০ থেকে ২০০ জনের একদল দুর্বৃত্ত তাণ্ডব চালায়। ভুক্তভোগী জয়নাল আবেদিন জানান, তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সাহায্য চেয়েও পাননি, পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে হামলাকারীরা অফিসের বিভিন্ন কক্ষ তছনছ করে নগদ ১৫ লাখ টাকা, ৫টি ল্যাপটপ, ২টি এসি, ৩টি সিসিটিভি ক্যামেরাসহ অফিসের আসবাবপত্র ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় বাড়ির মালিক আনোয়ার হোসেন রিপন ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি মো. আব্দুল হালিম জানান, এ ঘটনায় লিমন ও মনোয়ার হোসেন সাদ্দাম নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা চুক্তিতে টাকা নিয়ে জমি দখল ও ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও জোনের এডিসি জুয়েল রানা জানান, জনি ও রেজাউলের নেতৃত্বে হামলাকারীরা টিনের বেড়া ভেঙে অফিসে ভাঙচুর চালায় এবং পরে নতুন বেড়া দিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করে।
ইসিবি চত্বরে ইউটিউবারের স্টুডিওতে গুলি ও তাণ্ডব
শনিবার রাতে ইসিবি চত্বর সংলগ্ন নিউ গিনি প্রপার্টিজে ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে দুই থেকে আড়াইশ সশস্ত্র মানুষের একটি দল গুলি ছুড়ে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। স্টুডিওর স্বত্বাধিকারী কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেন, চাঁদার টাকা না পেয়ে বিএনপির লোকজন এই হামলা চালিয়েছে।
নিউ গিনি প্রোপার্টিজের কর্মকর্তা মো. পল্লব আলী জানান, হামলাকারীরা ৫টি পিকআপে করে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে করতে ভেতরে ঢোকে।
এই চাঁদাবাজির বিষয়টি রাতারাতি হয়নি। নিউ গিনি প্রোপার্টিজের মালিক মো. নাজিম উদ্দিন ভুঁইয়া জানান, সেখানে তার ১০ কাঠা জমি রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা গত এক মাস ধরে কখনো এক কোটি, কখনো ৫০ লাখ, আবার কখনো দুই কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করে আসছিল। চাঁদা না পেয়ে জমিটি দখলের উদ্দেশ্যেই এই হামলা।
স্থানীয়রা জানান, এই জমি নিয়ে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট রাতেও হামলা-লুটপাট হয়েছিল, যা নিয়ে এলাকায় ‘ডাকাতি’ হচ্ছে বলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।
এ বিষয়ে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম বলেন, জমি দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে। তবে এই ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারী শাহারিয়ার রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দেউলিয়াত্ব
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করার পর পুলিশ বাহিনী কার্যত ভেঙে পড়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও আইনশৃঙ্খলার চিত্র ছিল বেশ নাজুক। একের পর এক ‘মব’ সন্ত্রাস, দখল, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় হামলা, ভাঙচুর ও দখলের সামনে পুলিশ কাবু হয়ে পড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ নিজেই আক্রান্ত হচ্ছে।
চাপের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘ঢাকায় যে তিনটি ঘটনা ঘটেছে তার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে এবং বেশ কয়েকজন আটক হয়েছে। অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, অপরাধীর পরিচয় অপরাধীই।
বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে সারা দেশে দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দলটির অনেক নেতাকর্মী বেপরোয়া আচরণ শুরু করেছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগের।’
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ও অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘পুলিশের তৎপরতা কমার পেছনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাদের মনোবল ভেঙে পড়া, মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া এবং জনবল সংকটসহ নানা কারণ রয়েছে। তবে পুলিশকে কার্যকর করতে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও যথেষ্ট দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিএমপি কমিশনারের দায়িত্ব পালন করা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, ‘যে দখল ও লুটপাট চলছে তা স্পষ্ট অরাজকতার চিত্র। রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে দখল সন্ত্রাস হলে সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া পুলিশের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ঢালাওভাবে পুলিশকে দোষারোপ করে প্রত্যাহার করা হলে তাদের মনোবল নষ্ট হবে। এসব ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক শক্তি জড়িত থাকার তথ্য সামনে এসেছে, তাই অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকারকে সততার সঙ্গে কঠোর হতে হবে।’


