রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ দখলে জড়িতদের অনেকে চিহ্নিত হয়েছে। একাধিক সিসিটিভি ফুটেজের সূত্রে পুলিশ তাদের শনাক্ত করেছে। এই ঘটনায় সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে ১২ জন, তবে হোতা হিসেবে আলোচনায় আসা বিএনপি নেতা হানিফ মিয়া ধরা পড়েনি।
ঘটনার নেপথ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম আলোচনায় থাকলেও তাকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘যে-ই জড়িত থাকুক, কেউ ছাড় পাবে না। তদন্ত চলছে। ভিডিও ফুটেজ ছাড়াও অনেকের নামে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।’ হানিফকে ধরতে অভিযান চলছে বলেও জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার রাতে তিন ঘণ্টা ধরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। দুই শতাধিক হামলাকারী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঢুকে প্রথমে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে। এরপর মূল্যবান যন্ত্রপাতি, ওষুধ, ভ্যাকসিন, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনসহ স্থাপনার একটি অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, দখলের অল্প সময় আগে শাহ আলী থানার সামনে শতাধিক লোক জড়ো হয়। সেখানে এক্সকেভেটর আনা হয়। পাশে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন এক বিএনপি নেতার অফিসের সামনে থেকে রাত ১২টার পর কয়েকশ লোক রাড্ডার উদ্দেশে রওনা হয়, যাদের অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রাড্ডা ভাঙচুর করে সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে টানানো সাইনবোর্ড ও ব্যানার সরিয়ে দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটির নিজস্ব সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর শুরু হয় সংস্কারকাজ, এর মধ্যেই চলছে চিকিৎসাসেবা। ক্লিনিকের ভেতরে স্বাস্থ্যকর্মীরা অবস্থান নিয়ে সেবা দিচ্ছেন। পাশাপাশি বাইরে চেয়ার-টেবিল বসিয়েও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় রোববার শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বিএনপির কারা জড়িত
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেই রাতে শাহ আলী থানার পাশে ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ লেলিন ওরফে শুটার লেলিন, শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরীর অফিসের পাশে একদল লোক জড়ো হয়। ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে তারা হেঁটে মিরপুর-১ নম্বর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের দিকে রওনা হয়।

পুলিশের কাছে থাকা একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মধ্যরাতে রাড্ডা দখলের আগে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াস, শাহআলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ, শুটার লেলিনের ঘনিষ্ঠ সামীর, হাসান, ভুলু, টাক্কু কবির, সোহেল, বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার ভাই শামীমসহ শতাধিক লোক একসঙ্গে রাড্ডার উদ্দেশে রওনা হন।

একাধিক মোটরসাইকেল ও সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে তাদের অনুসরণ করা হয়। ওই মাইক্রোবাসে মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেল, হানিফ, লেলিনসহ পাঁচজন বসে পরিস্থিতি নজরদারি করে নির্দেশনা দেন। এরপর ভাঙচুর, লুটপাট চলে।
এক্সকেভেটর মালিক ও চালক কী বললেন
মিরপুর বেড়িবাঁধ থেকে ভাড়া করা এক্সকেভেটরের মালিক শহিদুল ইসলাম। তার বাড়ি সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায়। তিনি বলেন, সন্ধ্যার দিকে একটি পুরোনো দোকান সরানোর কথা বলে সেটি ভাড়া করা হয়। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন সেটি ভাড়া করেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে এত রাতে মুখোশ পরা ও মাথায় লাল কাপড় বাঁধা লোকজন দেখে চালক ইয়াসিন আরাফাত ভয় পেয়ে যান।

আরাফাত বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের পাশের রাস্তা দিয়ে ঢোকার পর তিনি অবস্থা বুঝতে পারেন কিছু একটা দখল হচ্ছে। তিনি গাড়ি কাজ করছে না বলে সরে যেতে চাইলেও সুযোগ ছিল না। পরে স্থানীয় সোলেমানের সহযোগিতায় শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মারুফ বেড়িবাঁধ থেকে আরেকটি এক্সকেভেটর ভাড়া করে সেখানে নিয়ে যান।
মোহাম্মদপুর-আদাবরে বাড়ি দখল চেষ্টায় গ্রেপ্তার ১৩
মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ে জমি দখল চেষ্টা ও লুটপাটের ঘটনায় আটজন এবং শ্যামলী হাউজিং এলাকায় একটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
চাঁদ উদ্যান এলাকায় জমি দখলের চেষ্টার গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মো. লিমন, মো. মনোয়ার হোসেন সাদ্দাম, সাদ্দাম হোসেন, আবুল বাশার, সাইফুল ইসলাম, জীবন মিয়া, আসাদুল হক ও মো. হারুন।
গত শনিবার চাঁদ উদ্যান বেড়িবাঁধসংলগ্ন টুইন টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় একটি অফিসে একদল ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রবেশ করে। এ সময় তারা অফিসের মালামাল ভাঙচুর করে এবং অফিসে থাকা নগদ টাকা, অ্যাপল ম্যাকবুক, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, দুইটি এসি, সিসি ক্যামেরা ও ডিভিআর বক্সসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায়। এই ঘটনায় মামলা করার পর রবিবার মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকে দুইজনকে এবং সোমবার ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এদের সবাই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই ও মারামারির মামলা রয়েছে।
শনিবার ভোরে ১৫ থেকে ২০ জন মুখোশধারী ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে শ্যামলী হাউজিং লিমিটেডের ৬ নম্বর রোডের ৪১ ও ৪২ নম্বর প্লটের ওপর নির্মিত একটি ভবনে হামলা চালায়। তারা ভবনে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা করে এবং প্রধান ফটকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে দরজা-জানালা ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধন করে। পুলিশ বলছে, এই ঘটনায় নেতৃত্বে ছিলেন খুরশিদ আলম খানের নেতৃত্বে হাবিবুল্লাহ ওরফে রাসেল, কালামসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজন।
আদাবর থানায় মামলা করার পর পুলিশ অভিযানে নামে। সোমবার মধ্যরাতে আদাবর থানা এলাকা থেকে আবুল কালাম আজাদকে এবং ভোরে মো. রাসেল, মো. আতিকুল, মো. রাসেল পিয়াদা ও লিয়নকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এই বাড়িটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। এ নিয়ে আদালতে মামলাও চলছে।
তবে মিরপুরের ইসিবি চত্বর সংলগ্ন নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং সেখানে থাকা কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়নি পুলিশ। এই ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে আগেই।


