দেশে দ্রুত বাড়তে থাকা অসংক্রামক রোগের (এনসিডি) চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণসেবা গ্রাম পর্যায়ে সম্প্রসারণে ৩৯৬ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
এর আওতায় দেশের ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিক, ৬৪টি জেলা হাসপাতাল ও ৪৩০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ ছাড়া, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগসহ প্রধান অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পাশাপাশি মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার (এমএনসিএইচ) মানোন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
‘হেলথ সিস্টেম স্ট্রেন্থেনিং থ্রু এমএনসিএইচ সার্ভিসেস ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড এনসিডিজ কন্ট্রোল’ শীর্ষক প্রকল্পটি জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৮ মেয়াদে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। সকাল ১০টায় বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৭৫ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। আর প্রকল্প সাহায্য হিসেবে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ ৩২১ কোটি ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ১৪ হাজার ৫০০ কমিউনিটি ক্লিনিকের জন্য কম্পিউটার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৪ হাজার ৬০০টি সেন্টারের জন্য চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার সামগ্রী কেনা হবে। এসব উপকরণের মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, রোগীর তথ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চতর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রেফারেল কার্যক্রম জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ও ফলোআপ সেবা আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উপজেলা এবং উপজেলা থেকে জেলা হাসপাতালে রোগী রেফারেলের ধারাবাহিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ বর্তমানে মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য এসব রোগ দায়ী। এর মধ্যে হৃদরোগ বা কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ একাই মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশের জন্য দায়ী।
জাতীয় এসটিইপিএস জরিপ-২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বয়স-সমন্বিত ডায়াবেটিসের প্রাদুর্ভাব ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। একই বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রাদুর্ভাব ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রকল্প প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, তামাকের ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এর ফলে চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী এ পরিস্থিতিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকল্পটির মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের পাশাপাশি মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার মান ও প্রাপ্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের পটভূমিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও গ্রামীণ এলাকার দরিদ্র ও কম শিক্ষিত নারী এবং নবজাতকেরা এখনো বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্গম ভৌগোলিক এলাকা ও মানবিক সংকটপূর্ণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার ফলাফলও তুলনামূলকভাবে কম।
এ অবস্থায় কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উপজেলা ও জেলা পর্যায় পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, রেফারেল ও ফলোআপের পাশাপাশি জনসচেতনতা, তথ্যব্যবস্থা, তদারকি ও গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের সেবার মান ও প্রাপ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে রোগী রেফারেল ব্যবস্থা, জনসচেতনতা, তদারকি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রধান অসংক্রামক রোগ-সম্পর্কিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর হার কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।


