কম বয়সেই বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি

কম বয়সেই বাড়ছে হৃদরোগের ঝুঁকি
ইলাস্ট্রেশন: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশে কম বয়সী মানুষের মধ্যেও হৃদরোগের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো ঝুঁকির কারণে এখন জীবনের শুরুর দিকেই দেখা দিচ্ছে হৃদরোগের ঝুঁকি।

মঙ্গলবার বিশ্ব হৃদপিণ্ড দিবস পালন করছে বাংলাদেশ। এ বছর বিশ্ব হৃদ্‌ ফেডারেশনের প্রচারের প্রতিপাদ্য, ‘একটি স্পন্দনও মিস করবেন না’।এর মাধ্যমে মানুষকে হুদরোগের লক্ষণগুলো দ্রুত শনাক্ত করা এবং ঝুঁকির বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিশ্ব হৃদপিণ্ড ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদপিণ্ড ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগে ৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৃত্যুর ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশের জন্য দায়ী হৃদপিণ্ড ও রক্তনালির রোগ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগসহ অসংক্রামক রোগে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ ঘটে। এসব মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি হয় বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগেই।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী পরামর্শক দেবাশীষ দেবনাথ টাইমসকে বলেন, কম বয়সী মানুষের মধ্যেও হৃদরোগ এখন বেশি দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বসে থাকা জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও ধূমপান কম বয়সেই হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে মদ্যপান ও মাদক গ্রহণ।

কম শারীরিক কার্যক্রম ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস হতে পারে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায় বলে জানান তিনি।

বড় ঝুঁকি এখনো তামাক

বাংলাদেশে হৃদরোগের অন্যতম প্রতিরোধযোগ্য কারণ হলো তামাক ব্যবহার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে ২০১৭-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ ধূমপান করেন এবং ২০ দশমিক ৬ শতাংশ ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন।

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ ধূমপানের কথা জানিয়েছেন। ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহার করেন ১৬ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ এবং ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ নারী।

ডব্লিউএইচওর ২০২৬ সালের বাংলাদেশ তামাকবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে তামাক ব্যবহারের কারণে বাংলাদেশে ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ওই বছর মোট মৃত্যুর ২১ দশমিক ৯ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল তামাক।

ডব্লিউএইচও বলছে, হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের অন্যতম বড় ঝুঁকি তামাক ব্যবহার। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে পরিবর্তন অনুমোদন করে। ডব্লিউএইচও বলেছে, এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণে বিধিনিষেধ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা শক্তিশালী হয়েছে।

আরও পড়ুন

দেবাশীষ দেবনাথ বলেন, কম বয়সে হৃদরোগ প্রতিরোধে তামাক ব্যবহার কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নীরবে বাড়ে উচ্চ রক্তচাপ

হৃদরোগের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো উচ্চ রক্তচাপ। তবে অনেক মানুষ জানেন না যে তারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন, কারণ অনেক সময় এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না।

বিশ্ব হৃদপিণ্ড ফেডারেশনের বাংলাদেশ প্রোফাইল অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বয়স-সমন্বিত উচ্চ রক্তচাপের হার ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ।

ডব্লিউএইচও বলছে, কারও উচ্চ রক্তচাপ আছে কি না, তা জানার একমাত্র উপায় হলো নিয়মিত রক্তচাপ মাপা। চিকিৎসা না করলে উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ, স্ট্রোক ও অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করলে সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।

ডব্লিউএইচওর ২০২৫ সালের বৈশ্বিক উচ্চ রক্তচাপ প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছুটা অগ্রগতি করেছে। ডব্লিউএইচওর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, তাদের কর্মসূচির আওতাভুক্ত এলাকায় ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৬ শতাংশ হয়েছে।

উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসাকে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত করা, নিয়মিত পরীক্ষা ও রোগীর ফলোআপ জোরদারের ফলে এই উন্নতি হয়েছে। তবে এসব তথ্য শুধু ওই কর্মসূচির আওতাভুক্ত এলাকার জন্য প্রযোজ্য; পুরো দেশের চিত্র হিসেবে এটি ধরা যাবে না।

প্রতিরোধ শুরু করতে হবে আগেই

ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ বলেছে, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এখনো যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার মতো সক্ষমতাও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় পুরোপুরি তৈরি হয়নি।

ডব্লিউএইচও বলছে, প্রধান ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করা গেলে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে মানুষের ঝুঁকি পরীক্ষা করা এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতে পারে।

বাংলাদেশে গ্রাম পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বড় নেটওয়ার্ক রয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল পর্যন্ত দেশে ১৪ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু ছিল এবং সেগুলো নিয়মিত সেবা দিচ্ছিল। প্রতিটি ক্লিনিক প্রায় ১২ হাজার মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার দায়িত্বে ছিল।

তবে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পথে বাংলাদেশে জনবল সংকট, সেবার মান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম এ মুকিত মনে করেন, স্থানীয় পর্যায়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ ও দ্রুত শনাক্তকরণের দিকে আরও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী গুরুতর অবস্থায় যাওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার ওপর নির্ভর না করে জেলা হাসপাতাল থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা শুরু করা উচিত।

জেলা হাসপাতালগুলোতে আগেভাগে পরীক্ষা করা গেলে হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে গুরুতর অবস্থায় যাওয়ার আগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

দেবাশীষ দেবনাথও কম বয়সে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং তামাক ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থ এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad