বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি রোগীর মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ

বেঙ্গালুরুতে বাংলাদেশি রোগীর মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ছাব্বিশ বছর বয়সী তানজিলা ইসলাম আশা স্বামীকে নিয়ে ভারতের বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন উন্নত চিকিৎসার আশায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরতে হয়েছে স্বামীর মরদেহ নিয়ে। সঙ্গে রয়েছে স্বামীর চিকিৎসা এবং এমন এক বিল নিয়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন, যে পরিমাণ অর্থের কথা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।

নওগাঁর বাসিন্দা আশা গত ৫ সেপ্টেম্বর ৩২ বছর বয়সী স্বামী মোহাম্মদ আব্দুল হাকিম সবুজকে নিয়ে বেঙ্গালুরু যান। চুক্তিভিত্তিক সরকারি স্কুলশিক্ষক সবুজ কিডনিসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন এবং এর আগে বাংলাদেশে চিকিৎসাও নিয়েছিলেন।

উন্নত চিকিৎসার আশায় দম্পতি বেঙ্গালুরু পৌঁছান। ৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎ সবুজের তীব্র বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে বেঙ্গালুরুর ওল্ড এয়ারপোর্ট রোডের মানিপাল হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা দেখতে পান, তার শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা খুব কমে গেছে এবং তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।

আশাকে চিকিৎসকরা জানান, তার স্বামীর শরীরে গুরুতর ব্লকেজ রয়েছে এবং জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। পরে পরীক্ষায় দেখা যায়, তার ফুসফুসের বিভিন্ন অংশে রক্ত জমাট (ক্লট) তৈরি হয়েছে এবং একাধিক স্থানে ব্লকেজ রয়েছে। তিনি দুইবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন, তাকে ইসিএমও ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর সার্জনরা তার ফুসফুসে পালমোনারি থ্রম্বোএন্ডার্টেরেক্টমি অস্ত্রোপচার করেন।

ছবি: সংগৃহীত

ভাষাগত সমস্যার কারণে চিকিৎসকেরা কী বলছেন, তা পুরোপুরি বুঝতে পারছিলেন না বলে জানান আশা। তিনি বলেন, আইসিইউতে নেওয়ার পর স্বামীর সঙ্গে আর কথা বলার সুযোগ পাননি।

সবুজের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসকেরা তাকে জানান, তার ডান পায়ে রক্ত জমাটের প্রভাব পড়েছে এবং পা বাঁচানো সম্ভব নয়। ১৪ সেপ্টেম্বর তার পা কেটে ফেলতে হয়। পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর সবুজ মারা যান।

তবে ঘটনার চিকিৎসাগত বিবরণ নিয়ে হাসপাতালের বক্তব্য ভিন্ন। হাসপাতাল বলেছে, সবুজ গুরুতর শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন, তার হৃদ্‌যন্ত্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং তাকে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হয়। হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ও সার্জারি দলের সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও তিনি তার অসুস্থতার কারণে মারা যান।

স্বামীকে হারানোর পরও এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় আশাকে।

তিনি অভিযোগ করেন, স্বামীর মরদেহ ছাড়তে হাসপাতাল ৩৫.৭৯ লাখ রুপি বকেয়া চিকিৎসা খরচ দাবি করে। এর আগে চিকিৎসার সময় কিস্তিতে তিনি ৭.৫ লাখ রুপি পরিশোধ করেছিলেন। তবে ওই অর্থ পরিশোধের কোনো রসিদ তাকে দেওয়া হয়নি এবং চিকিৎসার শুরুতে সম্ভাব্য খরচের বিস্তারিত হিসাবও জানানো হয়নি বলে তার অভিযোগ।

‘আমি পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছিলাম,’ বলেন আশা। তার অভিযোগ, হাসপাতাল আট দিন স্বামীর মরদেহ আটকে রেখেছিল এবং তার পাসপোর্টও রেখে দিয়েছিল। তিনি বলেন, এত বড় অঙ্কের টাকা কীভাবে জোগাড় করবেন তা জানতেন না এবং বারবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে মরদেহ ছাড়ার অনুরোধ করেছিলেন।

পরিবারের দাবি, বিভিন্ন সময়ে হাসপাতাল যে অর্থ দাবি করেছে, তার পরিমাণ ভিন্ন ছিল। শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫ লাখ রুপি দাবি করা হয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

পরে আশা নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশন এবং ভারতে থাকা সহায়তাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

আরও পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গের মালদার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইরফান মুস্তাকিম পরিবারটিকে সহায়তা করেন। তিনি মরদেহ ছাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, তবে শুরুতে তা সফল হয়নি।

‘পরিবারটির নিজেদের মতো করে এই পরিস্থিতি সামলানোর কোনো উপায় ছিল না,’ মুস্তাকিম টাইমসকে বলেন। তিনি জানান, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা আশাকে পাসপোর্ট ফেরত পেতে এবং প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে সহায়তা করেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার সময় পরিশোধ করা অর্থের বাইরে মরদেহ ছাড়ানোর জন্য পরে পরিবারকে আর কোনো অর্থ দিতে হয়নি। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তোলার পর মরদেহ ছাড়ানো হয়।

মানিপাল হাসপাতালের এক কর্মকর্তা আশার অভিযোগ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি। এক বিবৃতিতে হাসপাতাল সবুজকে দেওয়া চিকিৎসার বিস্তারিত তুলে ধরে জানায়, তিনি গুরুতর অবস্থায় নিবিড় চিকিৎসা এবং বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তিনি অসুস্থতার কারণে মারা যান।

নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার সাইদুর রহমান বলেন, মিশন পরিবারটিকে সহায়তা করেছে এবং মরদেহ বাংলাদেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।

তিনি বলেন, পরিবারের করা অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাইবে হাইকমিশন।

ছবি: সংগৃহীত

বিলের বাইরে আরও প্রশ্ন

পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কীভাবে সবুজের কিডনিসংক্রান্ত অসুস্থতা গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতায় রূপ নিল এবং শেষ পর্যন্ত তার পা কেটে ফেলতে হলো।

ফোনে টাইমসের সঙ্গে কথা বলার সময় আশা জানান, ভারতে যাওয়ার আগে তার স্বামী বাংলাদেশে কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ঢাকার চিকিৎসকেরা বায়োপসি করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, তবে পরিবার ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আশা জানান, বেঙ্গালুরু পৌঁছানোর সময় তার স্বামীকে সুস্থই মনে হচ্ছিল এবং তারা ভেলোরের ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ৬ সেপ্টেম্বর তারা কিছু সময়ের জন্য বাইরে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে হঠাৎ সবুজের বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।

‘বাইরে যাওয়ার সময় সে পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল। হঠাৎ বলল, বুকে ব্যথা করছে এবং ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছে না,’ বলেন আশা।

এরপর তিনি স্বামীকে মানিপাল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার কর্মীরা তাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান এবং পরে আইসিইউতে ভর্তি করেন।

আশা বলেন, ভারতে যাওয়া এবং সেখানকার লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তিনি পরিবারের এক প্রতিবেশী, যাকে তারা টুটুল নামে চেনেন, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যবস্থার মাধ্যমে চিকিৎসার জন্য প্রায় ৭.৭ লাখ রুপি পাঠানো হয়েছিল।

ছবি: সংগৃহীত

মুস্তাকিম অভিযোগ করেন, ভাষা ও যোগাযোগের সমস্যার কারণে পরিবারটি মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বাংলাদেশি রোগীরা অনেক সময় হাসপাতাল নির্বাচন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে দালালের ওপর নির্ভর করলে বিশেষভাবে ঝুঁকিতে পড়েন।

পরিবারটি অভিযোগ করেছে, চিকিৎসার আগে সম্ভাব্য খরচের পরিষ্কার ধারণা দেওয়া হয়নি এবং তারা যে অর্থ পরিশোধ করেছে, তার যথাযথ নথিও রাখা হয়নি।

বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বাংলাদেশি রোগীদের হাসপাতাল, চিকিৎসক, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং বিলিং পদ্ধতি সম্পর্কে ভর্তি হওয়ার আগে নিজেরা যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন মুস্তাকিম।

এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালও এসব অভিযোগের প্রতিটির বিষয়ে আলাদাভাবে প্রকাশ্যে কোনো জবাব দেয়নি।

স্বামীর চিকিৎসা শেষে তাকে সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরার আশায় বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন আশা। কিন্তু ফিরতে হয়েছে একাই—স্বামীর মরদেহ নিয়ে, তাদের আট বছর বয়সী সন্তানের কাছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad