তরুণদেরও জটিল হৃদরোগ: চট্টগ্রামে বাড়ছে ব্লকের রোগী

তরুণদেরও জটিল হৃদরোগ: চট্টগ্রামে বাড়ছে ব্লকের রোগী
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

একসময় হৃদরোগকে মূলত বয়স্কদের সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যেও এখন হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে একাধিক ও জটিল ব্লক ধরা পড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সাম্প্রতিক চিত্রেও এমন প্রবণতার কথা জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী শামীম আল মামুন বলেন, বর্তমানে তরুণ ও বয়স্ক দুই বয়সের রোগীর মধ্যেই রক্তনালিতে একাধিক ও জটিল ব্লক পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রিং বসানোর প্রয়োজন হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত জাংক ফুড গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, ধূমপান, মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

শুধু রিং বসিয়ে এই রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরও জোর দিতে হবে।

বিভাগীয় পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই দশকে চমেক হাসপাতালে ২৫ হাজার ৯৪টি করোনারি এনজিওগ্রাম করা হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৬২৭ জন রোগীর হৃদযন্ত্রে রিং (স্টেন্ট) বসিয়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে হয়েছে। অর্থাৎ এনজিওগ্রাম করা রোগীদের প্রায় ২২ দশমিক ৪ শতাংশের ক্ষেত্রে চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্লকেজ পাওয়া গেছে, যার জন্য পিসিআই বা রিং বসানোর প্রয়োজন হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ের চিত্র আরও উদ্বেগের। ২০২৬ সালের প্রথম পৌনে নয় মাসে চমেক হাসপাতালে এক হাজার ৮৫৭টি এনজিওগ্রামের বিপরীতে ৮৩৯টি পিসিআই করা হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে এনজিওগ্রাম করা রোগীদের ৪৫ দশমিক ১৮ শতাংশের হৃদযন্ত্রে রিং বসানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় এই হার প্রায় দ্বিগুণ।

চিকিৎসকরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান থেকে শুধু হৃদরোগের সামগ্রিক প্রকোপের হিসাব করা যায় না; কারণ এনজিওগ্রামের জন্য রোগী বাছাই ও হাসপাতালে আসা রোগীদের ধরন সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। তবে চমেকের চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের মধ্যেও একাধিক ও জটিল করোনারি ব্লকের রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

বদলে গেছে তরুণদের জীবনযাপন

চিকিৎসকদের মতে, তরুণদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় গত কয়েক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় বসে থাকা, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়ামের অভাব, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ ক্যালরির খাবার, ধূমপান এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরির পরিবেশ তৈরি করছে।

বিশেষ করে কর্মজীবী তরুণদের বড় একটি অংশ দিনের দীর্ঘ সময় অফিস, কম্পিউটার কিংবা মোবাইলের সামনে কাটাচ্ছেন। কর্মব্যস্ততার কারণে নিয়মিত শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাসও অনেকের মধ্যে গড়ে উঠছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ঘুম, ধূমপান এবং মানসিক চাপ।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো ঝুঁকিও অনেক সময় তরুণদের মধ্যে উপেক্ষিত থাকে। বয়স কম হওয়ায় অনেকেই নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা কিংবা কোলেস্টেরল পরীক্ষা করান না। ফলে ঝুঁকি তৈরি হলেও তা শনাক্ত হতে দেরি হয়।

আরও পড়ুন

চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগের ঝুঁকি শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না। পারিবারিক ইতিহাস, ধূমপান, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা, স্থূলতা এবং জীবনযাপনের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

বুকব্যথা হলে অবহেলা নয়

তরুণদের ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা হলো- বয়স কম হওয়ায় বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গকে অনেক সময় গুরুত্ব না দেওয়া। অথচ হৃদযন্ত্রের সমস্যার ক্ষেত্রে বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, অস্বাভাবিক ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা কিংবা ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উপসর্গ দেখা দিলে বয়স কম বলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে ধূমপায়ী, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী কিংবা পরিবারে অল্প বয়সে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

 

শুধু রিং নয়, প্রতিরোধেও জোর

চমেকের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিং বসিয়ে একটি নির্দিষ্ট ব্লকের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে নতুন ব্লক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাপনে পরিবর্তন জরুরি।

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পরিমিত ও সুষম খাবার গ্রহণ, ধূমপান বর্জন, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী কোলেস্টেরল ও অন্যান্য ঝুঁকি পরীক্ষা করানোর পরামর্শও দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

কাজী শামীম আল মামুন বলেন, হৃদরোগ প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ জরুরি। শুধু রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা দেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আগেই প্রতিরোধের দিকে নজর দিতে হবে।

 

বাড়ছে চিকিৎসার চাপ, প্রয়োজন সক্ষমতা বৃদ্ধি

চমেক হাসপাতাল চট্টগ্রাম বিভাগের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি পর্যায়ে হৃদরোগ চিকিৎসার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সরকারি ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম খরচে এনজিওগ্রাম ও রিং বসানোর সুযোগ থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত রোগীদের বড় একটি অংশের নির্ভরতার জায়গা এই হাসপাতাল।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এনজিওগ্রামে সরকারি ফি ও প্রয়োজনীয় কিটসহ প্রায় চার থেকে আট হাজার টাকা খরচ হয়। বেসরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষায় খরচ হতে পারে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা। রিং বসানোর ক্ষেত্রেও চমেকে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয় হতে পারে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা বা তারও বেশি।

ফলে কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকায় চমেকের হৃদরোগ বিভাগে রোগীর চাপও বেশি। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই চাপ সামাল দিতে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যাথল্যাবের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

 

শিশু হৃদরোগেও রয়েছে ঘাটতি

বয়স্ক ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের চিকিৎসায় চমেকের হৃদরোগ বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও শিশু হৃদরোগ চিকিৎসায় এখনও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ বছরে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন ধরনের ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা হয়েছে মাত্র ৫১টি। এর মধ্যে পিডিএ ডিভাইস ক্লোজার ছয়টি, এএসডি ১৫টি, ভিএসডি ১৫টি, পিটিএমসি ১৮টি এবং বিএপি ১টি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিশেষায়িত শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং পেডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরনের চিকিৎসার সুযোগ এখনও সীমিত।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad