ইরানে ‘চার নিরাপত্তাকর্মী হত্যায়’ সরকারবিরোধী ২ বিক্ষোভকারীর ফাঁসি

ইরানে ‘চার নিরাপত্তাকর্মী হত্যায়’ সরকারবিরোধী ২ বিক্ষোভকারীর ফাঁসি
মজিদ নিকানদিশ (ডানে) ও আলী হেম্মতি। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে গত জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া দুই ব্যক্তিকে বুধবার ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। দেশটির বিচার বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে চারজন নিরাপত্তাকর্মীর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকা এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগ এনেছে।

বিচার বিভাগ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুই ব্যক্তির নাম আলী হেম্মতি ও মাজিদ নিকানদিশ বলে নিশ্চিত করেছে। তাদের আন্দোলন ও সহিংসতার ‘মাঠপর্যায়ের কর্মী’ হিসেবে বর্ণনা করে বিচার বিভাগ জানিয়েছে, দেশের সুপ্রিম কোর্ট তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পর এবং আনুষঙ্গিক আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে এই ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

দেশটির বিচার বিভাগের সংবাদমাধ্যম ‘মিজান’ জানিয়েছে, হেম্মতি ও নিকানদিশ ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি মাশহাদের তাবরসি এলাকায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তারা একটি দোকানে হামলা, ভবনে অগ্নিসংযোগ ও সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধনের ঘটনায় জড়িত ছিলেন।

হেম্মতির ‘কথিত’ স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে মিজান দাবি করেছে, তিনি ধারালো ছুরি দিয়ে বাসিজ বাহিনীর এক সদস্যকে আক্রমণ করেন। পরে সেই ছুরিটি নিকানদিশের হাতে তুলে দিলে নিকানদিশ সেটি দিয়ে অন্য আরেকজনকে আঘাত করেন। তবে ওই চার নিরাপত্তাকর্মীর মধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কার মৃত্যুর জন্য তাদের দায়ী করা হয়েছে, তা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে তাদের এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চারজনের প্রাণহানির বিষয়টি ঠিক কীভাবে সম্পর্কিত ছিল, তারও স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

বিচার বিভাগ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, আটককালে নিকানদিশের কাছ থেকে তিনটি পেট্রোল বোমা ও একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছিল। তা ছাড়া তিনি বিক্ষোভের ভিডিও চিত্র ধারণ করে বিদেশে কয়েকজনের কাছে পাঠিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয়।

তবে ওই ভিডিও কার কাছে পাঠানো হয়েছিল বা বার্তার বিষয়বস্তু কী ছিল, সে তথ্য গোপন রাখা হয়েছে। মিজানের প্রতিবেদনে বলা হয়, হেম্মতির বাড়ি থেকে এমন কিছু সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে, যেগুলো একটি দোকান থেকে লুট করা হয়েছিল বলে বিচার বিভাগ দাবি করেছে।

তবে এসব গুরুতর অভিযোগের পক্ষে কোনো আদালতের নথি বা স্বাধীন প্রমাণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। দুই আসামির ‘কথিত’ স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর করেই মূলত পুরো মামলার বিবরণ প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন

সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনালকে জুলাই মাসে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছিল, নিকানদিশের ফাঁসি যেকোনো সময় কার্যকর হওয়ার চরম আশঙ্কা ছিল।

গত ১৫ মে মাশহাদের বিপ্লবী আদালতের প্রথম শাখা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রাজাভি খোরাসান প্রদেশের কুচান শহরের বাসিন্দা নিকানদিশকে ২০ জানুয়ারি গ্রেপ্তার করে মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে পাঠানো হয়। তখন বিভিন্ন মানবাধিকার সূত্র জানিয়েছিল, তাকে দীর্ঘ দিন একাকি কারাবন্দী রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা এবং জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল।

হেম্মতি ও নিকানদিশকে ঠিক কী অবস্থায় কারাগারে আটকে রাখা হয়েছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ কীভাবে করা হয়েছিল কিংবা তারা নিজেদের পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো স্বাধীন তথ্য পাওয়া যায়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইরানি কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে গুপ্তচরবৃত্তি, জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ, সশস্ত্র বিদ্রোহ, ‘সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধে শত্রুতা’ এবং ‘পৃথিবীতে দুর্নীতি ছড়িয়ে দেওয়ার’ মতো অস্পষ্ট অভিযোগ এনে ভিন্নমত দমন ও রাজনৈতিক বিরোধীদের সরিয়ে আসছে।

বিক্ষোভকারী ও রাজনৈতিক বন্দীদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আইনি ভিত্তি তৈরিতেই এসব অভিযোগ নিয়মিত ব্যবহার করা হয়।

জানুয়ারির বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে, হেম্মতি ও নিকানদিশের ফাঁসি তারই অংশ। এর আগে গত ১৬ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গাড়ি দিয়ে হামলার অভিযোগে শাহরাম সাদেঘিকে এবং ২৩ আগস্ট মাজিদ আদিনেহকে ফাঁসি দেয় ইরান।

এ ছাড়া সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ১৯ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ওমিদরেজা হায়দারিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাশহাদের ভাকিলাবাদ কারাগারে আটক আরেক বিক্ষোভকারী হোসেইন রাসুলিনেজাদের বিরুদ্ধেও একই সাজা বহাল রয়েছে।

অধিকার সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ গত ১৫ সেপ্টেম্বর জানিয়েছিল, জানুয়ারির বিক্ষোভে আটক অন্তত ১০০ জন বিক্ষোভকারীর ফাঁসি হওয়ার চরম ঝুঁকি রয়েছে। সংগঠনটির হিসাব মতে, ওই সময় পর্যন্ত বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া অন্তত ২৯ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছিল। হেম্মতি ও নিকানদিশের ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে এই সংখ্যা বেড়ে এখন অন্তত ৩১ জনে দাঁড়াল।

এদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও জাতিসংঘের বিষেশজ্ঞরা এমন একাধিক মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত করেছেন, ইরানের বিপ্লবী আদালত অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে এবং চরম অন্যায্য প্রক্রিয়ায় এসব মৃত্যুদণ্ডের রায় দিচ্ছে। এসব বিচার প্রক্রিয়ায় আসামিদের সঙ্গে আইনজীবীদের যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং নির্যাতন করে আদায় করা স্বীকারোক্তিকে প্রধান প্রমাণ ধরে সাজা দেওয়া হয়েছে।

এই কারণে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব অভিযোগকে যথেচ্ছ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাজা হিসেবে আখ্যায়িত করছে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছে, ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনা এসব অভিযোগকে কোনোভাবেই স্বাধীনভাবে প্রমাণিত সত্য তথ্য হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad