গাজায় চলমান যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের হামলায় সাংবাদিকসহ অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতয়ায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাসের মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা থাকলেও প্রায়ই তা অমান্য করে গাজায় হামলা চালিয়ে আসছে তেলআবিব।
গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তর জানিয়েছে, বুধবার নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুহাম্মদ আবদেল আজিজ আল-নাজ্জার। তবে তিনি কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি দপ্তরটি।
গণমাধ্যম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আল-নাজ্জারকে নিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ২৬৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকদের বরাতে আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, আলাদা ঘটনায় বুধবার গাজা নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তাল আল-হাওয়া এলাকায় যাত্রীবাহী একটি ভ্যানে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন।
অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবা পরিচালনাকারী মানবিক সংস্থা ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, তাদের কর্মীরা হামলায় আহত ১৩ জনকে আল-কুদস হাসপাতালে নিয়ে যান। তাদের মধ্যে বেশিরভাগের অবস্থা সংকটাপন্ন।
গাজা নগরী থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খুদারি বলেন, ‘চিকিৎসকেরা বলছেন, আহতদের জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর ইসরায়েলি হামলা ও অবরোধের কারণে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। আগামী কয়েক ঘণ্টায় এ হামলায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।’
এর আগে ফিলিস্তিনের সরকারি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, গাজা নগরীর আল-শিফা হাসপাতালের কাছে একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত এক নারী নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই শিশুসহ চার ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় আরও দুই ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন। একই সময়ে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় খান ইউনিসেও ইসরায়েলি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া গেছে।
এসব হামলার মধ্যেই গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার সকালে প্রকাশিত দৈনিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আগের ২৪ ঘণ্টায় অন্তত নয়জনের মরদেহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
তাদের মধ্যে আটজন নতুন করে নিহত হয়েছেন। আর আগের হামলায় আহত এক নারী পরে মারা গেছেন। এতে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গত অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত এক হাজার ৪৩১ জনে দাঁড়িয়েছে।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একই সময়ে অন্তত পাঁচ হাজার ২৬ জন আহত হয়েছেন। বুধবার ২৪ ঘণ্টাতেই আহত হয়েছেন ৩১ জন।
হিন্দ খুদারি বলেন, ‘গাজায় যুদ্ধবিরতি থাকার কথা, কিন্তু ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সহিংসতার যেন শেষ নেই। প্রতিদিন ফিলিস্তিনিরা নিহত ও আহত হচ্ছেন এবং মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে।’
গাজার বাসিন্দাদের পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘উপত্যকার সবাই এখন দোকানে যেতে, সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যেতে এবং স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনযাপন করতেও ভয় পাচ্ছেন।’
গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে অন্তত ৭৪ হাজার ৩২ জন নিহত এবং আরও এক লাখ ৭৫ হাজার ১৪২ জন আহত হয়েছেন।
গত আগস্টে জাতিসংঘের স্যাটেলাইট কেন্দ্রের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় ধ্বংস হওয়া স্থাপনার সংখ্যা আরও ৯ শতাংশ বেড়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮২ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে তা প্রায় দুই লাখ ভবন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এসব ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।


