মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে এক নারীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া এবং পরে আরও ৪০ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে নওগাঁর বদলগাছীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) বিরুদ্ধে। শুধু অর্থ দাবি নয়, ওই নারীর প্রতিবন্ধী ছেলের মাথায় হাত দিয়ে আরও টাকা দেওয়ার শপথ করানোর অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী শ্রীমতি স্মৃতি।
অভিযোগের পাশাপাশি এ ঘটনায় ৪৩ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপও এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। তবে ওই কথোপকথনের অপর প্রান্তের ব্যক্তি অভিযুক্ত এএসআই মো. আব্দুল মোমিন কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযুক্ত কর্মকর্তা অবশ্য অর্থ লেনদেনের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।
সোমবার দুপুরে বদলগাছী উপজেলার মিঠাপুর ইউনিয়নের জগপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শ্রীমতি স্মৃতি ওই গ্রামের মৃত বিমল মণ্ডলের ছেলে সঞ্জয় কুমার মণ্ডলের স্ত্রী।
স্মৃতির অভিযোগ, ঘটনার দিন দুপুর দেড়টার দিকে নওগাঁ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চার থেকে পাঁচ সদস্যের একটি দল তাদের বাড়িতে যায়। তার স্বামী সঞ্জয় কুমার মণ্ডল মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত এমন সন্দেহে বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। তবে তার স্বামী মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন বলে জানালেও একপর্যায়ে এএসআই মো. আব্দুল মোমিন তাকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন স্মৃতি।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য, তার স্বামী হৃদরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। প্রতিবন্ধী ছোট ছেলের সামনেই তাকে দুটি চড় মারা হয়। বাবাকে মারধরের দৃশ্য দেখে তার বড় মেয়েও অজ্ঞান হয়ে যান বলে দাবি করেন তিনি।
স্মৃতি বলেন,মাদক ব্যবসার সঙ্গে তার স্বামীর নাম না জড়ানোর জন্য তিনি কর্মকর্তাদের কাছে বারবার অনুরোধ করেন। একপর্যায়ে তার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। বাড়িতে এত টাকা নেই জানালে স্বামীকে আরও মারধর এবং তাকেও মামলা দিয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়।
এরপর ভয়ে প্রতিবন্ধী ছেলের চিকিৎসার জন্য রাখা ১০ হাজার টাকা দেন বলে দাবি করেন স্মৃতি। তার অভিযোগ, ওই টাকা নেওয়ার পরও বিষয়টি শেষ হয়নি। আরও ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এমনকি তার প্রতিবন্ধী ছেলের মাথায় হাত রেখে ওই টাকা দেওয়ার শপথও করানো হয়।
স্মৃতির দাবি, শপথ করানোর পর তাকে একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে নওগাঁয় টাকা নিয়ে যেতে বলা হয়। এএসআই মোমিনের সঙ্গে এ বিষয়ে একাধিকবার ফোনে কথাও হয়েছে বলে দাবি করেন ভুক্তভোগী।
বুধবারের ওই ঘটনার সময়কার ৪৩ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপ পাওয়া গেছে। সেখানে এক নারীকে বলতে শোনা যায়, ‘কালকে জোগাড় করতে পারিনি।’ এর জবাবে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, ‘আপনি কোথায় আছেন, অফিসে আসবেন আজকে।’
পরে নারীটি জানান, তিনি জেলগেটে গিয়েছিলেন এবং তার স্বামী তার সঙ্গে ‘চাওয়া-পাওয়ার যা আছে’ তা দিয়ে দিতে বলেছেন। জবাবে অপর প্রান্ত থেকে তাকে অফিসে আসতে বলা হয়। অফিস কোথায় জানতে চাইলে এরপর আর কোনো উত্তর না দিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তবে ফোনালাপটির কণ্ঠস্বর এএসআই মো. আব্দুল মোমিনের কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ওই দিন মাদকবিরোধী অভিযানে সঞ্জয় কুমার মণ্ডল (৪২) ও বিকাশ মণ্ডল (৪০) নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হলে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসরাত জাহান ছনি বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা ওই দুই ব্যক্তিকে তার কাছে নিয়ে আসেন। তাদের নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া যাওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তবে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না জানিয়ে ইউএনও বলেন, এ ধরনের ঘুষের বিষয়ে আমার জানা নেই। আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের সঙ্গে এ ধরনের বিষয় জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না। তারপরও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এএসআই মোমিনের বিরুদ্ধে কী করা যায়, তা দেখছি।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এএসআই মো. আব্দুল মোমিন। তার দাবি, সঞ্জয় ও বিকাশকে তারা আটক করেছেন এবং পরে ইউএনওর মাধ্যমে তাদের তিন মাস করে কারাদণ্ড হয়েছে। কিন্তু ওই নারীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া বা টাকা চাওয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
মোমিন বলেন, ‘ওই নারীর সঙ্গে টাকার বিষয়ে আমার কোনো কথা হয়নি। অনেকেই আমার মোবাইল নম্বরে ফোন করেন। গতকালও ওই নারী ফোন করেছিলেন। তার সঙ্গে আমার মাত্র ৩০ সেকেন্ড কথা হয়েছে। আমার কল লিস্ট দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। টাকার বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি।’
বরং ওই নারী তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর জন্য ফোন করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তার জানা নেই। প্রতিবেদকের কাছ থেকেই তিনি বিষয়টি প্রথম শুনেছেন।
তিনি বলেন, ‘আটক দুই ব্যক্তি মাদকের সঙ্গে জড়িত এটা আমি জানি। সে কারণেই তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। ওই অভিযানে পরিদর্শক সাইফুলও ছিলেন।’
অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নওগাঁ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সাইফুল আলম। তবে তিনি জানান, একাধিক বাড়িতে অভিযান পরিচালনার কারণে তাদের দলটি পরে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
সাইফুল আলম বলেন, ‘ওই দিন আমরা একসঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়েছিলাম। পরে একাধিক বাড়িতে অভিযান হওয়ায় দুটি দলে ভাগ হয়ে যাই। সঞ্জয়ের বাড়িতে আমি যাইনি। সেখানে কী ঘটেছে, তাই আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়।’
আরও পড়ুন: সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ঘুষ: গ্রেপ্তার ২ কর্মচারীর জবানবন্দি


