নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, পেয়েছেন নিয়োগপত্রও। কিন্তু কর্মস্থলে ইসলামী ফাউন্ডেশন নীলফামারী কার্যালয়ে যোগ দিতে পারেননি আব্দুল আলিম শেখ। উচ্চ আদালত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও সেটিও মানা হয়নি। পরে নিয়োগটি বাতিলই করে দেওয়া হয়।
ভুয়া ঠিকানা ও জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ তুলে যোগদান স্থগিত করেছিলেন ফাউন্ডেশনের উপপরিচালক মোছাদ্দেকুল আলম। পরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, জেলা বিশেষ শাখা (ডিএসবি) এবং ইসলামী ফাউন্ডেশনের একজন কর্মকর্তার তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো অসত্য তথ্য দেওয়ার অভিযোগের প্রমাণ মেলেনি।
আলিম শেখের অভিযোগ, চাকরিতে যোগ দিতে তাকে তিন লাখ টাকা দিতে বলা হয়। তিনি দুই দফায় এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাকি টাকার দাবিতে তাকে আটকে দেওয়া হয়।
একটি ফোনে মোছাদ্দেকুলের সঙ্গে আলিমের কথোপকথনের রেকর্ডও আছে। এতে উপপরিচালককে বলতে শোনা যায়, ‘এই টাকা তো দেওয়া লাগবে ডিসি অফিস ও হেড অফিসে।’
তবে ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপপরিচালক মোছাদ্দেকুল। তার তাবি, আলিম হজে যাওয়ার সময় তাকে ২৮ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। ওই টাকা তাকে জোর করে ফেরত দেওয়া হয়েছিল।
আলিমের কাছে থাকা একটি ফোনালাপের রেকর্ডে টাকা দেওয়ার বিষয়ে কথোপকথন রয়েছে। এতে শোনা যায়, তিনি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য উপপরিচালককে অনুরোধ করেন। জানান, আপাতত আরও ৩০ হাজার টাকা দিতে পারবেন এবং পরে আরও ২০ হাজার টাকা দেবেন।
নিজের ছাগল বিক্রি করে টাকা জোগাড় করার কথাও বলেন তিনি। কথোপকথনের একপর্যায়ে মোছাদ্দেকুল আলমের কণ্ঠে শোনা যায়, ‘এই ৩০ হাজার টাকায় কিচ্ছু হবে না। টাকা বেশি দেওয়া লাগবে।’
আলিমের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন, এতে তার কোনো দায় নেই।
২০২৪ সালের ১৫ মার্চ নীলফামারী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের কেয়ারটেকার পদে নিয়োগ পরীক্ষা হয়। ওই পরীক্ষায় পাস করেন জলঢাকার খারিজা গোলনা এলাকার আলিম শেখ।
ওই বছরের ১৭ এপ্রিল তাকে জলঢাকা সাধারণ রিসোর্স সেন্টারের কেয়ারটেকার পদে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। ২২ এপ্রিল তিনি জেলা কার্যালয়ে যোগ দিতে যান। তখনই তার ঠিকানা ও শিক্ষাগত সনদ নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। উপপরিচালক মোছাদ্দেকুল তার যোগদান স্থগিত করেন।
এরপর শুরু হয় তদন্ত। আলিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখে তিনটি তদন্ত কমিটি। ২০২৪ সালের ১ ও ২ অক্টোবর তদন্ত কমিটিগুলো প্রতিবেদন জমা দেয়। এসব প্রতিবেদনে লেখা আছে, তার ঠিকানা ও সনদ জাল হওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
এরপরও চাকরি না পেয়ে প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদনও করেন আলিম। নথিপত্র অনুযায়ী, আদালত বিষয়টি ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। কিন্তু প্রায় ১১ মাস পর, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর নিয়োগটি বাতিল করে দেওয়া হয়।
প্রকল্প পরিচালক এস এম তরিকুল ইসলামের সই করা ওই স্মারকে আবারও জাল সনদের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়।
আলিম বলেন, ‘যে অভিযোগ নিয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছিল এবং যেসব তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি, সেই একই অভিযোগে কেন নিয়োগ বাতিল করা হলো?’
মোছাদ্দেকুল বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিয়োগ বাতিল করেছে। এ বিষয়ে আমার কোনো দায় নেই।’
এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সরকারি বাড়িভাড়া নেওয়ার পরও জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামী ফাউন্ডেশন কার্যালয়ের একটি অতিথিকক্ষে বসবাসের অভিযোগ রয়েছে। ওই কক্ষে সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এসি, ফ্রিজ ও বৈদ্যুতিক চুলা চালানো হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোছাদ্দেকুল দাবি করেন, তিনি সেখানে মাঝেমধ্যে থাকেন।
ইসলামী ফাউন্ডেশনের রংপুর বিভাগীয় পরিচালক তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ‘নিয়োগপ্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক এস এম তরিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নীলফামারীর ডিসি মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামানের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতেই চাননি।


