চলতি সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পোর্টালে প্রোফাইল আপডেট করতে গিয়ে খটকা লাগে শিক্ষার্থীদের। অনেকেই দেখেন, তথ্য পূরণের জন্য নতুন একটি ঘর যোগ করা হয়েছে, যেখানে তাদের ‘জাত বা সম্প্রদায়’ জানতে চাওয়া হচ্ছে।
এই ঘরটি খালি রেখে প্রোফাইল জমা দেওয়া যাচ্ছিল না। ফলে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন এই তথ্য দরকার পড়ল, তা নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে।
বিষয়টি নিয়ে ‘টাইমস’-এর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমুজাদ্দেদী আলফেছানী শুরুতে দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন কোনো অপশন চালু করেনি।
তবে পোর্টালে এই অপশনের প্রমাণ দেখানোর পরপরই তিনি সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডেকে সেটি অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই অপশনটি আসলে কে এবং কেন যুক্ত করেছিল?
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি সেল এর কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি। সেখানকার এক কর্মকর্তা জানান, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই। শিক্ষার্থীদের প্রোফাইল সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয় দেখাশোনা করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পুরোনো কাগজের ফরম হুবহু ডিজিটাল করতে গিয়েই এই ঝামেলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পোর্টাল তৈরির সময় আগের ফরমে যেভাবে ছিল, আমরা ঠিক সেভাবেই তথ্য অনলাইনে তুলে দিয়েছি। কোন তথ্য কেন চাওয়া হচ্ছে, তা আমাদের জানা নেই। আইনি কোনো প্রয়োজনে লাগতে পারে ভেবে আমরা আগের কোনো ঘরের তথ্যই বাদ দিইনি।’
তবে পোর্টালে জাতপাতের ঘর রাখা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় এই ধরনের পরিচয়ের কোনো স্থান নেই।
অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী—সামাজিক শ্রেণি, বংশ, পদমর্যাদা বা সম্পত্তির ওপর ভিত্তি করে সমাজকে আলাদা করাই হলো ‘জাতপাত’ (কাস্ট)।
নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করতে জাত বা বর্ণের তথ্য চাওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জাত বা বর্ণ পরিচয়ের তথ্য চাওয়া একদমই অনুচিত। এতে শিক্ষাঙ্গনে বিভেদ বাড়ে, বৈষম্য ছড়ায় এবং স্বজনপ্রীতি ও অস্পষ্টতার সুযোগ তৈরি হয়।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতিআরা নাসরীন বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে এসে নতুন করে জাতপাতের পরিচয় ফিরিয়ে আনা ভুল সিদ্ধান্ত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের সংবিধান ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার ও আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সেখানে কেন একজন শিক্ষার্থীর জাত জানতে হবে, তা ভেবে আমি অবাক হচ্ছি।’
বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরাও। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে মাইমুনা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পদক্ষেপে তিনি বেশ হতাশ। তার মতে, ‘আজকের যুগে এসে এই তথ্যের কোনো দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।’
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তাহসান আলিফ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবার জন্য সমান অধিকার ও মেধাই আসল পরিচয়। তিনি বলেন, ‘পোর্টালে ‘জাত’ বা ‘সম্প্রদায়’-এর মতো ঘরের প্রয়োজনই নেই। এগুলো শুধু শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব তৈরি করে।’
অপশনটি বাদ দেওয়ার আদেশ দেওয়ার আগে অধ্যাপক আলফেছানী জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। তিনি স্বীকার করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ভেদাভেদ থাকার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, ‘আমি কখনোই এমন ভেদাভেদ সমর্থন করি না।’
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সদস্য মো. শাহিনুর রহমান জানান, ছাত্র প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না। তিনি জানান, ডাকসুর পক্ষ থেকে প্রশাসনকে এমন অপশন রাখতে বলা হয়নি এবং এ নিয়ে কোনো কথাও হয়নি।


