সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুসিচ পদত্যাগ করেছেন। দেশটির আগাম সংসদ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রোববার তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। বলকান অঞ্চলের এই দেশটিতে প্রায় দুই বছর ধরে চলা তীব্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে আগামী নির্বাচনটি ভুসিচের দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভুসিচের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব আগামী বছরের মে মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী পরপর তিনবার প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করার সুযোগ নেই। তাই আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে নিজ দল ডানপন্থী সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতৃত্ব দিতে তিনি পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানান। এ খবর জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জনতুষ্টিবাদী দলটিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে তরুণদের সমর্থনপুষ্ট একটি উদীয়মান আন্দোলন। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর উত্তরাঞ্চলীয় নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর এই ক্ষোভের সূত্রপাত হয়।
ওই ঘটনায় দায়ীদের কঠোর শাস্তির দাবিতে মাঠে নামেন বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে তাদের এই ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী লড়াই একটি শক্তিশালী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। গত ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ভুসিচ সরকারকে গদিচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়েই এবার নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছে তরুণদের এই জোট। ভুসিচ নিজে গত ১২ বছর ধরে কখনো প্রধানমন্ত্রী, আবার কখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় রয়েছেন।
পদত্যাগের লিখিত ঘোষণা পড়ে শোনানোর সময় ভুসিচ বলেন, ‘আমি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করছি।’
আসন্ন অক্টোবরের নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহমে। ব্যাপক জনঅসন্তোষ সত্ত্বেও নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার সবরকম চেষ্টা চালাচ্ছে ভুসিচের দল। ভুসিচের প্রধানমন্ত্রী পদে দাঁড়ানোর কৌশলকে শীর্ষ ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিপরীতে দলের ভিত শক্ত করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পদত্যাগপত্রে আনুষ্ঠানিক সই করার আগে বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বাইরে অপেক্ষমাণ সমর্থকদের উদ্দেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন ভুসিচ। তিনি বলেন, ‘আজ রাতটি আমার জন্য খুব বিশেষ। এই সুন্দর ভবনে এটাই আমার শেষ সন্ধ্যা।’
এ সময় সমর্থকেরা তার নাম ধরে উল্লাস ও স্লোগান দিতে থাকলে তিনি যোগ করেন, ‘তবে আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ভবিষ্যতের দিকে তাকাচ্ছি। সামনে আমাদের নতুন বিজয় অপেক্ষা করছে। চলুন, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও বড় ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে হারাই।’
নির্বাচন সামনে রেখে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভুসিচ সারা দেশ চষে প্রচার কর্মসূচি চালিয়েছেন, যা সরকারি অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। তিনি নতুন সড়ক উদ্বোধন করেছেন, আর্থিক অনুদান ও সুলভ মূল্যে ওষুধ সরবরাহের আশ্বাস দিয়েছেন এবং ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গেছেন। এমনকি কিছু প্রচার কর্মসূচিতে যাওয়ার জন্য তাকে নিজের ভাইয়ের গাড়ি চালাতে দেখা গেছে।
সার্বিয়ায় সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ও পাওয়ার অনেক বেশি। তবে ভুসিচ তার টানা দুই মেয়াদের দশ বছরের শাসনামলে প্রেসিডেন্ট পদে থেকেও পুরো ক্ষমতার কেন্দ্রে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন। কখনো কখনো তিনি সরাসরি মন্ত্রিসভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন এবং মূল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনাগুলো তিনিই ঘোষণা দিতেন।
এদিকে স্বাধীন সামাজিক গবেষণা সংস্থা বিআইআরওডিআই অভিযোগ করেছে, প্রেসিডেন্ট পদে থাকা অবস্থায় ভুসিচ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নিজ দলের প্রচার চালিয়েছেন। ভুসিচ অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন, আর সরকারের অধীনস্থ দুর্নীতিবিরোধী কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ভুসিচের পদত্যাগের পর সাময়িকভাবে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সামলাবেন তার আস্থাভাজন মিত্র ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী আনা ব্রনাবিচ। তিনি বর্তমানে সার্বিয়ার ২৫০ সদস্যের পার্লামেন্টের বিদায়ী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ভুসিচ জানিয়েছেন, ৯০ দিনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে এই বছরের শেষ নাগাদ নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ভুসিচ ও তার দলের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সঙ্গে সমঝোতা এবং স্বাধীন ও সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যম দমনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা ছিনিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে বলে বিরোধীদের দাবি। যদিও দলটি ক্ষমতার অপব্যবহার অস্বীকার করে আসছে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাওয়া নির্বাচনী জোটটিতে স্থান পেয়েছেন দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের উদীয়মান ও স্বল্পপরিচিত বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, অধ্যাপক এবং অ্যাথলেটরা। দেশে আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি নির্মূলের বার্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের কয়েকটি দল সাইকেলে করে সারা দেশ চষে বেড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জনসমর্থনের সূচকে শিক্ষার্থীদের জোট এবং ভুসিচের দল এখন প্রায় সমান অবস্থানে লড়াই করছে। ফলে এবারের ভোটটি একটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পাশাপাশি ভুসিচ সরকারের ওপর এক প্রকার গণভোটের রূপ নিয়েছে। ভুসিচের জোটসঙ্গী সমাজতান্ত্রিক দল, ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী বিরোধী জোটসহ ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দলও এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।
ভুসিচ জানিয়েছেন, সোমবার থেকে তিনি ‘সার্বিয়ার প্রতিটি প্রান্তে ঘুরে মানুষের কথা শুনবেন’। নিজের পূর্ববর্তী সরকারের উন্নয়নকাজের মূল্যায়ন করে তিনি বলেন, ‘আমি ভুল করেছি, তবে এই পদে থাকা অন্য যেকোনো মানুষের চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করেছি।’
পদ ছাড়ার শেষ মুহূর্তে ভুসিচ মোট ৪৯ জন কারাবন্দিকে ক্ষমা করার আদেশ দিয়েছেন। এদের মধ্যে ২৩ জন বিক্ষোভ চলাকালে বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন এবং কয়েকজন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কর্মীও রয়েছেন, যারা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হওয়ার পর সার্বিয়া ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
বিক্ষোভ দমন করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশি নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের মতো কঠোর পথ বেছে নিয়েছিল। তা ছাড়া ভুসিচ কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই বারবার দাবি করেছেন, বিদেশি শক্তি ও দেশের ভেতরের কিছু অজ্ঞাত গোষ্ঠী সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ‘রাষ্ট্র ধ্বংস করার’ ষড়যন্ত্র করছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিএসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোববার ভুসিচ আবারও একই আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিদেশি মদদে ভোটের রাতে দেশে বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টির তোড়জোর চলছে।
ভুসিচের আমলেই ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সার্বিয়ার আলোচনা থমকে দাঁড়ায়। দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর চাপানো নিষেধাজ্ঞায় সাড়া না দেওয়াকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করে বিশ্ব সম্প্রদায়।


