ভোরের আলো ফুটতেই কাস্তে হাতে মাঠে ছুটছেন মাদারীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলার কৃষকেরা। কেউ গোড়া থেকে পাট কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন। আবার কেউ কাটা পাট কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছেন পাশের খাল, ডোবা কিংবা জলাশয়ে। পানিতে সারি সারি পাটের আঁটি–সব মিলিয়ে মাদারীপুরের গ্রামাঞ্চলে এখন সোনালি আঁশ ঘরে তোলার ব্যস্ততা।
জেলার শিবচর, কালকিনি, রাজৈর, ডাসার ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মাঠে পাট কাটতে দেখা গেছে কৃষকদের। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে পাট কাটা, বহন ও জাগ দেওয়ার কাজ। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি দিনমজুররাও যুক্ত হয়েছেন এ কাজে। ফলে পাট কাটার মৌসুমকে ঘিরে গ্রামীণ জনপদে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। মাদারীপুর সদর উপজেলার পাঁচখোলা ইউনিয়নের বাহেরচর কাতলা গ্রামের
কৃষক আলমগীর বাদশা জানান, কয়েক মাসের পরিচর্যার পর এখন পাট কাটার সময় এসেছে। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, আগাছা পরিষ্কার ও সেচসহ বিভিন্ন কাজে তাদের বেশ টাকা খরচ হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিকের মজুরি। তাই ভালো ফলন পাওয়ার পরও বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না।
শিবচর উপজেলার কাদিরপুর ইউনিয়নের পাটচাষি আজমল গোমস্তা বলেন, ‘এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু চাষে খরচও কম হয়নি। পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার জন্য আলাদা শ্রমিক লাগছে। বাজারে ভালো দাম না পেলে লাভ থাকবে না।’
অন্য কৃষক হামিদ খান বলেন, ভালো মানের আঁশ পেতে জাগ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পানি ও সময় দুটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ বছর কোথাও কোথাও অতিরিক্ত পানি আবার কোথাও প্রয়োজনীয় পানির অভাব কৃষকদের ভোগান্তিতে ফেলছে। নিচু জমির কৃষকেরা দ্রুত পাট কেটে ফেলছেন। কারণ অতিরিক্ত পানিতে দীর্ঘদিন পাটগাছ ডুবে থাকলে গাছ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আঁশের মানও কমে যেতে পারে।
কালকিনির উপজেলার সাহেবরামপুর ইউনিয়নের কৃষক আনিছ সরদারের ভাষ্য, ‘পাট কেটে এখন জাগ দিতে হবে। পানির ব্যবস্থা আছে বলে সুবিধা হচ্ছে। কিন্তু সব জায়গায় এমন নয়। পাটের ভালো দাম পেলে পরিশ্রমটা সার্থক হবে।’
কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা এখন বাজারদর ঘিরে। স্থানীয় বাজারে পাটের দর নির্ধারণে মৌসুমের শুরুতে নানা ধরনের ওঠানামা দেখা যায়। কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বাড়লেও তারা সব সময় তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে অনেক সময় কৃষকের কাঙ্ক্ষিত দামও পাওয়া যায় না।
রাজৈরের এক পাটচাষি বলেন, ‘পাট বিক্রির সময় যেন ন্যায্য দাম পাই, সেটাই আমাদের চাওয়া। সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ থাকলে কৃষক বেশি লাভবান হবেন।’
মাদারীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরে মাদারীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৩৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ৩৭ হাজার ৫৬ হেক্টর জমিতে। বেশি চাষ হওয়ায় ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের চোখে মুখে আনন্দের ছায়া ফুটে উঠেছে। বর্তমানে পাটে উৎপাদনে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকায় মাদারীপুরের মাঠে এখন সেই সম্ভাবনারই ছবি। কৃষকের ঘাম আর শ্রমে ধীরে ধীরে ঘরে উঠছে সোনালি আঁশ।
কৃষকের প্রত্যাশা, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। আর কয়েক মাসের এই কঠোর পরিশ্রম শেষে পাট বিক্রির টাকায় স্বস্তি ফিরবে কৃষকের সংসারে।


