হরমুজ প্রণালি খোলা না বন্ধ, তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার দাবি করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ খোলা ও সচল রয়েছে। তবে ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ থাকবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন কোনো আলোচনা নির্ধারিতও নেই। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, মার্কিন নৌ অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে, হরমুজ প্রণালি খোলা আছে এবং সেখানে থাকা সব মাইন অপসারণ অথবা বিস্ফোরিত করে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের দাবির নাকচ করে দেশটির শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ পার্লামেন্টে বলেছেন, জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, ইরানের জব্দ সম্পদ ছাড় করা এবং সামরিক হুমকি ও অভিযান বন্ধ করা।
এদিকে হরমুজ নিয়ে এমন বিরোধের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়েছে। সোমবার একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইরান ‘পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ সামরিক অবস্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে মঙ্গলবার নতুন কোনো হামলার খবর পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি বলেও বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। প্রাথমিক জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার প্রণালিটি দিয়ে পারাপারের সংখ্যা এক অঙ্কে নেমে আসে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস জানিয়েছে, মঙ্গলবার প্রণালি দিয়ে বের হওয়ার সময় একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ইঞ্জিনকক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি একজন ক্রু আহত হয়েছেন। ওমানের কোস্ট গার্ড বাকি ক্রুদের সহায়তা করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতও জানিয়েছে, ইরান থেকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে। তারা বলছে, ক্ষেপণাস্ত্র দুটি সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। তবে পরে দুটিই সাগরে পড়ে যায়। ইরান এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়েও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না। অথচ সোমবার তার জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার জানিয়েছিলেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে এবং আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় তা আরও জোরালো।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহাম্মদ মোখবেরও মঙ্গলবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসার বিষয়ে তেহরান এখনো আগ্রহী। তবে আলোচনা মানে আত্মসমর্পণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) বৃহত্তর চুক্তির জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। তবে প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের মধ্যেই সমঝোতাটি ভেঙে পড়ে।
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। সংঘাতের সময় ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল। মঙ্গলবার দাম আরও ২০ সেন্ট বেড়ে ৯১ ডলারের কিছু ওপরে স্থির হয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।


