চলতি মৌসুমে বন্যার প্রকোপ না থাকায় সিরাজগঞ্জে আমন চাষে কৃষকের ব্যস্ততা বেড়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকায় জমি প্রস্তুত ও ধানের চারা রোপণের কাজ পুরোদমে চলছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের কৃষকরাও এবার ঝুঁকি নিয়ে আমন আবাদে নেমেছেন।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ৭৬ হাজার ১৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য চার হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে বীজতলা প্রস্তুত করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ১৪ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।
উল্লাপাড়া, তাড়াশ ও রায়গঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ইতোমধ্যে জমি প্রস্তুত করে চারা রোপণ শুরু করেছেন কৃষকেরা। স্থানীয়ভাবে ব্রি ধান-৭১, ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-১০৩সহ বিভিন্ন উন্নত জাতের ধান আবাদ করা হচ্ছে।
তাড়াশ উপজেলার গুল্টা গ্রামের কৃষক বেলায়েত হোসেন বলেন, এবার এখন পর্যন্ত বন্যা না হওয়ায় নিচু জমিতেও ধান লাগানোর সুযোগ হয়েছে। সময়মতো চারা রোপণ করতে পারলে ভালো ফলন পাওয়ার আশা করছি। গত বছর বন্যার কারণে অনেক জমিতে ঠিকমতো আবাদ করতে পারিনি, তাই এবার জমি ফেলে রাখতে চাই না।
উল্লাপাড়া উপজেলার বড় হার গ্রামের কৃষক মো. খোকন মিয়া জানান, ধান চাষে খরচ আছে, তবে আমন ধানে ভালো ফলন হলে লাভও হয়। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় আমরা আগেভাগেই জমি তৈরি করেছি। এখন শুধু চারা রোপণের কাজ চলছে।

তবে, টানা বৃষ্টিতে কিছু এলাকায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চারা নিয়ে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় হাটবাজারে বর্তমানে প্রতি মণ (৮০ মুঠা) ধানের চারা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
রায়গঞ্জ উপজেলার তিননান্দিনা গ্রামের কৃষক ফয়সল আহমেদ বলেন, বৃষ্টির কারণে আমাদের এলাকার কিছু বীজতলা নষ্ট হয়েছে। তাই বাইরে থেকে চারা কিনতে হচ্ছে। আগে যে দামে চারা পাওয়া যেত, এখন তার চেয়ে কিছুটা বেশি দাম দিতে হচ্ছে। ছোট কৃষকদের জন্য এই বাড়তি খরচটা চাপ তৈরি করছে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কল্যাণী গ্রামের কৃষক মো. আজাদ হোসেন বলেন, বন্যা না থাকায় এবার নিচু জমিতেও আমন লাগাতে পারছি। সরকার থেকে বীজ-সার পেলে আমাদের অনেক উপকার হয়। ধানের দাম ভালো থাকলে এবার চাষ করে খরচ তুলে কিছু লাভ করা সম্ভব হবে।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শর্মিষ্ঠা সেনগুপ্তা জানান, এ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৪০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি প্রণোদনার আওতায় দুই হাজার ৬০০ কৃষককে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে।
উল্লাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন সুমি বলেন, এ উপজেলায় ১১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে এবার বন্যা না থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অন্তত ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন আবাদ হতে পারে.
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম নাসিম হোসেন জানান, সদর উপজেলায় ১২ হাজার ২১০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অনুকূল পরিস্থিতির কারণে এর বাইরে আরও প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মুজাহেরুল মাওলা বলেন, টানা বর্ষণে কিছু এলাকায় বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বর্তমানে জেলায় বড় ধরনের চারা সংকট বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা নেই। কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।


