মন্ত্রিসভা সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর যে খসড়া অনুমোদন করেছে, তাতে এই কমিশন মানবাধিকার সুরক্ষার বদলে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের সুরক্ষার সুযোগ তৈরি করবে।
সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আয়োজিত মতবিনিময়ে বক্তারা এসব কথা বলেন।
তারা বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা দিতে হবে। পাশাপাশি কমিশনের সদস্য বাছাই ও নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনটি বর্তমান কাঠামোয় পাস হলে মানবাধিকার সুরক্ষার বদলে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের সুরক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে।’
আইনটি সংসদে যাওয়ার পর যথাযথ আলোচনা এবং সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর দাবি জানান তিনি। বলেন, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নিয়েই আইনটি পর্যালোচনা করা দরকার।
ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, নতুন আইনটি ২০০৯ সালের আইনের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও শুধু সামান্য অগ্রগতি যথেষ্ট নয়। গত কয়েক বছরের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও শক্তিশালী আইন প্রয়োজন।
মানবাধিকার কমিশনকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার, নির্যাতন থেকে মুক্তির অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বৈষম্য দূরীকরণ এবং সমতার অধিকারসহ বিস্তৃত মানবাধিকার নিয়ে কমিশনকে কাজ করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।
তিনি বলেন, অতীতে সংবেদনশীল অভিযোগ কমিশনে গেলে ‘এ বিষয়ে মামলা হয়েছে’—এমন যুক্তি দেখিয়ে অনেক সময় অভিযোগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো ঘটনায় মামলা চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্যাতন বা অন্য কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন কি না, সেটি কমিশনের দেখার সুযোগ থাকা উচিত।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, ‘তদন্তের আগে, তদন্ত চলাকালে বা তদন্তের পর প্রতিটি পদক্ষেপে যদি কোনো সরকারি অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন কঠিন হয়ে পড়বে।’
বাগেরহাটের মোংলার মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তাকে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাকে আনার বিষয়টি স্বীকার করলেও পরবর্তীতে তাকে চেনার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। এ ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।’
তার মতে কমিশনে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে যারা সৎ, সাহসী, দক্ষ ও যোগ্য। বর্তমান প্রস্তাবিত বাছাই ও গঠন প্রক্রিয়ায় কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
সভায় বক্তারা বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গুমের ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদেরই যদি তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে আলামত নষ্ট করা বা তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনভাবে তদন্ত, পরিদর্শন ও তথ্য সংগ্রহের অধিকার দিতে হবে।
সাংবাদিক সোহবার হোসেন বলেন, একজন সাধারণ নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হলে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে যেতে পারবেন কি না এবং কমিশন তার অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার দিতে পারবে কি না–আইনে তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
মতবিনিময়ে ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের ইনক্লুশন উপদেষ্টা ভাস্কর ভট্টাচার্য, লেখক ও গবেষক অনুপম দেবাশিস রায় এবং বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল, খান খালিদ আদনান এবং গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী নওশীন নূর বক্তব্য দেন।


