রংপুরে ঘরে ঢুকে পরিবারের চার সদস্যের সবাইকে খুন করার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের শরীরে ‘ধস্তাধস্তির আঁচড়ের অসংখ্য চিহ্ন’ দেখে তাকে শনাক্তের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে পুলিশের ভাষ্য নিয়ে বিতর্ক আরও বড় হয়েছে। নতুন নতুন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে।
সিদ্ধার্থ ছাড়াও গ্রেপ্তার হওয়া মুগ্ধ দাস এরই মধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যায় সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলেও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে এ হত্যার ধরন, চারটি মরদেহের অবস্থান, বাড়ি করার সময় হুমকি এবং স্বজনের বক্তব্যের পর পুলিশের দাবি নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নে আরও বড় হচ্ছে।
বাসায় সারা রাত বিদ্যুৎ না থাকা, ইয়াবা সেবনের জন্য প্রতিবেশী দেবুর নির্মাণাধীন তিনতলার পুরো ফাঁকা স্পেস ও ছাদ ব্যবহার না করে কেন তারা গণপতির বাসার ছাদে গেল–এসব প্রশ্ন এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কোথায় গেল, এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে নিহত আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার চ্যাটিং। সেই চ্যাটিংয়ে তিনি তার বন্ধুকে লিখেছেন, ‘আমার বাসায় কারেন্ট নেই সারা রাত। বিদ্যুতের কী যেন হইছে, সবার বাসায় আছে; আমার বাসায় নেই। সারা রাত জাগলাম।’
নিহত গণপতির স্বজনেরা দাবি করছেন, এই হত্যার সঙ্গে শুধু দুইজন নাকি আরও কেউ ছিল তাও খুঁজে বের করতে হবে।
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে রংপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সিদ্ধার্থের শরীরে মানুষের আঁচড়ের অসংখ্য দাগ রয়েছে। এই দাগগুলো একজনের সঙ্গে আরেকজন মানুষের ধস্তাধস্তি হয়, এমন। সিদ্ধার্থ তার বাড়িতে ছিল না, পাশের আরেকটি বাড়িতে ছিল। সেখান থেকে তাকে আটক করা হয়।’
তিনি জানান, সিদ্ধার্থকে সঙ্গে নিয়ে মুগ্ধ দাসের বাড়িতে গেলে তিনি পালিয়ে যান। প্রায় এক ঘণ্টা পরে তাকে দখিগঞ্জ তুঁত ফার্মের ডোম ঘর থেকে ধরা হয়। দুইজনকে মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা এই হত্যার দায় স্বীকার করেন।
রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর মুখ্য মহানগর আদালত-২ এ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়। পুলিশের দাবি, জবানবন্দিতে খুনের দায় স্বীকার করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। এরপর দুইজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান পড়াতেন গণপতি। তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অবসরে যান। একসময় নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকলেও তিন বছর আগে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় নিজে বাড়ি করে বসবাস শুরু করেন।
যেসব প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক
গণপতির পূর্বপাশের বাড়ি ছিল দেবু নামের এক ব্যক্তির। তিনতলা বাড়িতে কাজ চলমান। দ্বিতীয় তলার পূর্ব ফ্লাটে এক ভাড়াটিয়া থাকেন। এ ছাড়া পুরো বাড়ি ও ভবন ফাঁকা। প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, এই বাড়িতে ইয়াবাসেবীরা মাদক না খেয়ে গণপতির দ্বিতীয় তলার বাড়িতে কেন গেলেন!
অবশ্য পুলিশ বলছে, গণপতি এবং গ্রেপ্তার দুইজন পূর্বপরিচিত। দেবুর বাসার ছাদ বেয়ে গণপতির বাসার ছাদে ওঠেন তারা। প্রথমে গণপতিকে, পরে তার স্ত্রী প্রীতিলতা এরপর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়, এরপর প্রিয়মকে। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এই খুনগুলো করা হয়েছে।
গণপতির শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার প্রায় দুই মাস আগ থেকে হঠাৎ করে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঘুমানো শুরু করেন জামাই বাবু। তার সঙ্গে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীও ঘুমাত।
গণপতির ভাতিজির স্বামী বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী জানান, বাড়ি করার সময় কিছু ব্যক্তি হুমকি দিয়েছিল।
‘আমি তার কাছে বারবার সেসব ব্যক্তির নাম শুনতে চাইলেও তিনি বলেননি। পরে জানান, তাদের সঙ্গে মীমাংসা করে ফেলেছেন। তিনি খুবই চাপা স্বভাবের মানুষ ছিলেন।’
প্রশ্ন উঠেছে, বাড়ি বানানোর সময় কারা হুমকি দিয়েছিল গণপতিকে।
‘গণপতির বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল কে’
গত শনিবার রাতে গণপতির বাসায় আলো জ্বলেনি। ফোন নম্বরগুলোও বন্ধ ছিল। তার শ্যালিকা পূজা চক্রবর্তী রাত সাড়ে ৯টা এসেও বাড়ি অন্ধকার পান। পরে পুলিশকে খবর দেন তিনি। আগামী চক্রবর্তী সকাল ৫টা ৫০ মিনিটে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে এক বান্ধবির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন।
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস টাইমসকে বলেন, ‘আমার ছেলে ভালো ছিল কিন্তু মাদকে শেষ করে ফেলছে। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর বাড়িতে ছিল না। তখন বন্ধু সীমান্তের বাসায় ছিল। পরদিন সকাল ১১টার দিকে আসছে।’
মুগ্ধর মা সেনা রানী দাসও বলেন, নেশার পেছনে গিয়ে তার ছেলের সব শেষ হয়ে গেছে।
দ্রুত বিচার দাবি
এ ঘটনায় দ্রুত বিচারের দাবিতে মিছিল করেছে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। রোববার বেলা ১২টার দিকে জিলা স্কুলের মোড় থেকে নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষ আবার সেখানে গিয়ে শেষ হয়।
স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, ‘দুইজনকে গ্রেপ্তার করার পরে পুলিশ যে ব্রিফিং করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গণপতির মরদেহ ছাদে দুই দিন পড়ে ছিল, সেখানে কি কোনো কাকও গেল না? কোনো দুর্গন্ধ বের হলো না!’
দুইজন কম বয়সী ছেলের পক্ষে চারজনকে হত্যা করার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের থাম্বায় চড়ে কে লাইন কেটে দিল!’
‘আমাদের প্রশ্ন ওই এলাকায় যে সিসিটিভির ক্যামেরাগুলো ছিল সেই ক্যামেরাগুলো কে বন্ধ করল’, বলেন তিনি


