যুদ্ধক্ষেত্র, হত্যার হুমকি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের সফর ঘিরে বাড়তি ও কঠোর নিরাপত্তার রীতি দীর্ঘদিনের। এমনকি যুদ্ধাবস্থায় প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন বিদেশ সফরও নানা সময়ে গোপন রাখার প্রচলন রয়েছে।
এসব সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিমানের জানালার পর্দা বন্ধ রাখা, প্রেসিডেন্টের মুখ আড়াল করতে তাকে নিচু করে টুপি পরানো, প্রেসিডেন্ট এবং তার সফরসঙ্গীদের মোবাইল ফোন জব্দ করা এবং তথ্য ফাঁস না করার জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করা হয়।
সম্প্রতি তুরস্ক থেকে ফেরার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্সিয়াল বিমান এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে গোপনে অন্য একটি বিমানে সরিয়ে নেওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকে এই ধরনের গোপন সফরের নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ৮ জুলাই আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় সাংবাদিক ও উপস্থিত কর্মকর্তাদের সামনেই এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন ট্রাম্প। এর পরপরই বিমানের পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন তার সফরসঙ্গী সাংবাদিকরা। আর সেই সুযোগে বিমানের খাবার পরিবহনের (ক্যাটারিং) ট্রাকে বিপরীত পাশের দরজা দিয়ে ওই প্লেন থেকে গোপনে ট্রাম্পকে সামরিক বিমানে তোলা হয়। অর্থাৎ, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সফরসঙ্গীদের ছাড়া একা আলাদা বিমানে তুরস্ক ছাড়েন। এর পেছনে ইরানের সম্ভাব্য্য ক্ষেপণাস্ত্র ও হত্যার হুমকিকে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।
তবে কয়েক দশক ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, এ ধরনের গোপন সফরের বিষয়ে আগে থেকেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দলকে জানানো হয় এবং তাদের গোপনীয়তা রক্ষার শপথ করানো হয়। প্রাণঝুঁকি থাকলে এবং কেউ চাইলে সফর থেকে নিজেদের প্রত্যাহারও করতে পারেন।
তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সফরের বিষয়ে অবহিত একটি সূত্র জানিয়েছে, এবার তা করা হয়নি। এর পেছনে প্রেসিডেন্টের সামনে থাকা তাৎক্ষণিক ঝুঁকিকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, সফরসঙ্গীদের জানানোর মতো পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্টের বিমান থেকে একটি ছোট সামরিক বিমানে স্থানান্তরের পুরো পরিকল্পনা সম্পর্কে কেবল অল্প কয়েকজন কর্মকর্তা জানতেন। এ জন্যই তাকে বের করতে একটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাক ব্যবহার করা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা মন্ত্রিসভার সদস্য ও সফররত সাংবাদিকসহ বিমানে থাকা অধিকাংশ মানুষই জানতেন না যে তারা যে বিমানে ছিলেন, সেটি আসলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির মধ্যে থাকা একটি বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে রাখা হয়েছিল।
কেবল ট্রাম্পই নন, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রেসিডেন্টও যুদ্ধক্ষেত্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এমন গোপন সফর করেছেন।
জর্জ ডব্লিউ বুশের বাগদাদ সফর
২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে থ্যাঙ্কসগিভিং উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের টেক্সাসের ক্রফোর্ডের খামারবাড়িতে রাতের খাবারের জন্য টার্কির সাদা মাংস, ভুট্টার রুটি ও প্রেইরি চ্যাপেলের পেকান পাইসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় খাবারের তালিকা প্রকাশ করেছিল হোয়াইট হাউস।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুশ সেই খাবার উপভোগ করতে সেখানে উপস্থিতই ছিলেন না। পরিচয় আড়াল করতে মাথায় নিচু করে টুপি পড়িয়ে তাকে গোপনে প্রেসিডেন্টের বিমানে ওয়াশিংটনের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়। সেদিন তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের খবর সংগ্রহে থাকা বিপুলসংখ্যক সাংবাদিককে পেছনে ফেলে তিনি একা এই সফর করেন।
সে সময় বিমান পরিবর্তনের কারণ হিসেবে জানানো হয়েছিল, সেটির রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন ছিল।
অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটিতে প্রেসিডেন্টের বিমানটি নির্ধারিত স্থানে যাওয়ার পর বুশ আরেকটি বিমানে উঠে বাগদাদের উদ্দেশে রওনা হন। ওই বিমানের সব আলো বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং জানালার পর্দা নামানো ছিল।
তথ্য ফাঁস ঠেকাতে বিমানের কর্মীরা সাংবাদিকদের ইলেকট্রনিক যন্ত্র সাময়িকভাবে নিজেদের কাছে নিয়ে নিয়েছিলেন।
এই সফরে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং ১৩ সদস্যের একটি সাংবাদিক দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তবে তাদের কয়েক দিন আগেই সফরের বিষয়ে জানানো হয়েছিল এবং সতর্ক করা হয়েছিল, যদি খবর ফাঁস হয়, তাহলে মাঝ আকাশ থেকেই বিমান ফিরিয়ে নেওয়া হবে। অবশ্য সেই সফরের খবর ফাঁস হয়নি।
পরে বুশ বাগদাদের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে গিয়ে বুশ সেনাদের সঙ্গে সময় কাটান। প্রেসিডেন্টের বিমান কেবল নিরাপদ এলাকায় ফিরে আসার পরই সাংবাদিকদের ওই সফরের খবর প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়।
বিল ক্লিনটনের পাকিস্তান সফর
২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ভারত ও পাকিস্তান সফরে ছিলেন। তখন মুম্বাই থেকে ইসলামাবাদ যাওয়ার জন্য তার প্রেসিডেন্টের বিমান ব্যবহারের কথা ছিল। ইসলামাবাদে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সঙ্গেও তার বৈঠক করার কথা ছিল।
এর আগের বছর পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেওয়া মোশাররফকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের উত্তেজনার কারণে প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টনের নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
সেদিনের একটি সফর প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্লিনটন একটি বিশাল সি-১৭ সামরিক বিমানের সামনের অংশ ঘুরে অন্য পাশে রাখা দুটি ছোট সামরিক বিমানের দিকে যান।
এর মধ্যে প্রথম বিমানটি ছিল সাদা রঙের, যার গায়ে কোনো পরিচয়চিহ্ন ছিল না। পেছনের বিমানটিতে প্রেসিডেন্টের বিমানের স্বাভাবিক যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিতি চিহ্ন ছিল।
ক্লিনটনকে সাদা রঙের বিমানটিতে উঠতে দেখা যায়। ওই বিমানেই তিনি ইসলামাবাদে যান।
বারাক ওবামার আফগানিস্তান সফর
অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের গোপন সফরের উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সেনাদের সঙ্গে দেখা করে তাদের উৎসাহ দেওয়া।
২০১৪ সালের মেমোরিয়াল ডে উদযাপনে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটিতে আকস্মিক সফর করেন। এটি ছিল ওই ঘাঁটিতে তার চতুর্থ সফর।
নিরাপত্তার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিকল্পনা করা হলেও ওবামার পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সফরের খবর গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি রওনা হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে হোয়াইট হাউস একটি ছোট সাংবাদিক দলকে সফরের জন্য প্রস্তুত করে।
বিমানবাহিনীর জ্যাকেট পরা ওবামা এই আকস্মিক সফর উপভোগ করছিলেন বলেই মনে করা হয়। প্রায় ৩ হাজার সেনাকে তিনি বলেন, কাছাকাছি এলাকায় থাকায় তিনি ভেবেছেন ‘একটু ঘুরে যাই’।
প্রথম মেয়াদের ট্রাম্পের ইরাক সফর
২০১৮ সালের বড়দিনের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পও ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সঙ্গে দেখা করতে আকস্মিক সফরে যান।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের প্রায় দুই বছর পর এটিই ছিল কোনো সংঘাতপূর্ণ এলাকায় তার প্রথম সফর। এর কয়েক দিন আগেই তিনি প্রতিবেশী সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সূত্র: রয়টার্স


