বিশ্ব শিক্ষক দিবস/ শিক্ষককে কাঠগড়ায় নয়, হাত শক্ত করাই সময়ের দাবি

শিক্ষককে কাঠগড়ায় নয়, হাত শক্ত করাই সময়ের দাবি
Advertisement
Advertisement

৫ই অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস—শিক্ষার আলো জ্বালানো কারিগরদের শ্রদ্ধা জানানোর দিন। ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে উদযাপিত এই বিশেষ দিনটি কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনের নয় বরং শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার এবং তাঁদের পেশাগত পরিবেশ পুনর্বিবেচনার এক মহান সুযোগ। তবে এ বছরের শিক্ষক দিবসে দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—শিক্ষকদের কেবল শুভেচ্ছাবার্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁদের বাস্তব জীবনচিত্র ও পেশাগত সংকটগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন করা।

কারণ, বর্তমান সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার করুণ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একটি আপ্তবাক্য আজ যেন নিত্যসত্য হয়ে উঠেছে—“শিক্ষক, তুমি যাই করো—দোষ তোমারই!” এটি কোনো কাল্পনিক উক্তি নয়, বরং প্রতিদিনের শ্রেণিকক্ষে ও সমাজে প্রতিটি শিক্ষকের অর্জিত নির্মম অভিজ্ঞতা।

এই অভিজ্ঞতার নেপথ্যে রয়েছে শিক্ষকতা পেশার এক অদ্ভুত দ্বিমুখী সংকট। আজ শিক্ষার্থীকে শাসন করলে শিক্ষক হন ‘রূঢ়’বা ‘নিষ্ঠুর’, আর অনুশাসন না রাখলে তাঁর গায়ে জোড়ে ‘অযোগ্যতা’র  তকমা। কঠিন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নিলে উঠে অভিযোগের পাহাড়, আবার সহজ প্রশ্ন করলে প্রশ্ন তোলা হয় ‘মেধা যাচাইয়ের মান’নিয়ে। নম্বরের বিচারেও ছাড় নেই—কম নম্বর দিলে অভিযোগ তিনি খাতা না দেখেই মূল্যায়ন করেছেন, আর বেশি নম্বর দিলে রটে যায় শিথিলতা বা স্বজনপ্রীতি গুঞ্জন। এমনকি পাঠদানের গতি নিয়েও রেহাই মিলছে না—দ্রুত পড়ালে বলা হয় শিক্ষক বোঝাতে ব্যর্থ, আর বিস্তারিত আলোচনা করে শেখাতে গেলে তৈরি হয় নির্ধারিত সময়ে সিলেবাস শেষ না হওয়ার তাগাদা।

পাঠদানের এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের চেয়েও বড় বৈপরীত্য দেখা যায় ফলাফল মূল্যায়নে। শিক্ষার্থীর ফল খারাপ হলে সমস্ত দায় অবলীলায় চাপানো হয় শিক্ষকের কাঁধে, অথচ একই শিক্ষার্থী ভালো ফল করলে তার সকল কৃতিত্ব চলে যায় তার নিজস্ব মেধায়—“ছাত্র তো স্বভাবতই ভালো ছিল!”

অথচ বাস্তবচিত্র হলো—একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অর্ধেকেরও বেশি সময় কাটে শ্রেণিঘরের বাইরে, তাঁর পরিবার ও সমাজের পরিমণ্ডলে। তার পর্যাপ্ত ঘুম, মাত্রাতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার, সঙ্গদোষ বা গুণ, পারিবারিক পরিবেশ কিংবা পড়াশোনায় অভিভাবকদের উদাসীনতা—এসবের কোনোটিই শিক্ষকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তা সত্ত্বেও, দিনশেষে শিক্ষার্থীর প্রতিটি ব্যর্থতা ও বিশৃঙ্খলার দায় শিক্ষকের দরজাতেই এসে আছড়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

এই বাস্তবতায় এ কথা সত্যি যে, শিক্ষককে অবশ্যই দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। কিন্তু একই সাথে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শিক্ষকও রক্ত-মাংসের একজন মানুষ। তাঁরও ক্লান্তি আছে, নিজস্ব পরিবার আছে এবং নানাবিধ ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাঁকে অলৌকিক কোনো দেবতার আসনে বসিয়ে অতিমানবিক কিছু প্রত্যাশা করার প্রয়োজন নেই, আবার সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থার যাবতীয় গলদের দায় একাই তাঁর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়াও কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে না।

ইতিহাসের পানে তাকালে দেখা যায়, একসময় শিক্ষকরা হয়তো শারীরিক শাসন বা বেত্রাঘাত করে শৃঙ্খলা বজায় রাখতেন—যা নিয়ে আধুনিক শিক্ষাতত্ত্বে বিতর্ক থাকতে পারে—কিন্তু তখন শিক্ষককে কেন্দ্র করে সমাজে একটি গভীর শ্রদ্ধাবোধের জায়গা ছিল। অথচ বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। শিক্ষকরা আজ কেবল শ্রদ্ধাহীনতার শিকারই নন, বরং বহু পাক্ষিক চাপের মুখে পিষ্ট। একদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক মানসিকতা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বেপরোয়া আচরণ ও তথাকথিত ‘মব’ কালচারের জিম্মি দশা—সবমিলিয়ে শিক্ষকরা আজ একপ্রকার ‘বলির পাঠা’য় পরিণত হয়েছেন। তাঁদের আত্মসম্মান, শারীরিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতাকে প্রতিদিন কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে।

এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের বুঝতে হবে যে, শিক্ষা কোনো একক ব্যক্তির প্রচেষ্টা নয় এটি একটি চতুর্মুখী যৌথ দায়িত্বের অংশ। যেখানে শিক্ষক দিশারী হয়ে সঠিক পথ ও নীতিজ্ঞান শেখাবেন, অভিভাবক কড়া নজরদারি ও মমতায় সন্তানকে আগলে রাখবেন, শিক্ষার্থীরা নিজ শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেবে এবং পরিচালনা পরিষদ ও রাষ্ট্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি সুষ্ঠু, নিরাপদ ও সহযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

তাই এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসে কেবল শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের নিজেদের কাছেই একটি মৌলিক প্রশ্ন করা উচিত—“আমরা শিক্ষকের কাছে নিখুঁত সেবা ও অসীম ধৈর্য প্রত্যাশা করি ঠিকই, কিন্তু বিপদে-আপদে কিংবা সম্মানের প্রয়োজনে তাঁর পাশে দাঁড়াই কি ততটাই?”

শুধুমাত্র শিক্ষকের একার পক্ষে একটি আদর্শ প্রজন্ম তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে একজন সম্মানিত, সুরক্ষিত ও যোগ্য শিক্ষক চাইলে একটি পথহারা প্রজন্মের দিক বদলে দিতে পারেন। তাই শিক্ষককে অহেতুক কাঠগড়ায় দাঁড় না করিয়ে তাঁর হাত শক্ত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

লেখক: অধ্যাপক, শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজ, ঢাকা

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad