২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের জান্তাকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার নীতি থেকে সরে এসে দেশটির সামরিক সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ও আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স। প্রাথমিকভাবে আলোচনার মূল লক্ষ্য মিয়ানমারে পরিচালিত অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বন্ধে দেশটির সহযোগিতা নিশ্চিত করা হলেও, এর মাধ্যমে বিরল খনিজসহ আরও বিস্তৃত বিষয়ে দুই দেশের যোগাযোগের পথ খুলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
গত ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানী নেপিডোতে অভ্যুত্থানের নেতা ও বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন ভ্যান্স। চারজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মতে, আটক মার্কিন ব্যবসায়ী অ্যাডাম ক্যাস্টিলোকে মুক্ত করার বিষয়টি বৈঠকের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। তবে এর পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও যোগাযোগের সুযোগও তৈরি হয়।
অভ্যুত্থানের পর এটিই মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ।
সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান মিন অং হ্লাইং এখনও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৬-১৭ সালের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও বিতাড়নের ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তার ওপর এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ওই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে ঘোষণা করেছে ওয়াশিংটন।
ভ্যান্সের সফরের দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর রাখাইন রাজ্যের একটি বাজারে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বিমান হামলা চালায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন।
তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যোগাযোগ করে। একই সঙ্গে সহিংসতা বন্ধ এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা আলোচনায় তুলে ধরে।
মিয়ানমারে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের সাবেক প্রধান অ্যাডাম ক্যাস্টিলোকে গত ১১ জুন ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দর থেকে আটক করে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ। সমর্থকদের দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সাজানো। তবে ক্যাস্টিলোকে অন্যায়ভাবে আটক করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে মার্কিন সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ক্যাস্টিলোর মুক্তির জন্য হোয়াইট হাউস, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ও পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা মিয়ানমারের সঙ্গে গোপন আলোচনায় বসেন।
মুক্তির পর ক্যাস্টিলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আর কোনো মন্তব্য করেননি।
মিয়ানমারে সক্রিয় অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রগুলো বন্ধ করাকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান যোগাযোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব কেন্দ্র থেকে প্রেমের সম্পর্কের নামে প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি পরিচালিত হয় এবং এতে মার্কিন নাগরিকেরা বিলিয়ন ডলার হারিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে এফবিআই সরাসরি মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলেও দুজন জানিয়েছেন।
তবে, এসব প্রতারণা কেন্দ্রের অনেকগুলোই সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে থাকা বিভিন্ন মিলিশিয়া-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিচালিত হয়। এসব কার্যক্রমের অর্থের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছে যেতে পারে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর পাশাপাশি মিয়ানমারের বিপুল পরিমাণ ভারী বিরল খনিজের মজুত নিয়েও মার্কিন কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত এসব খনিজের সরবরাহে চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় ওয়াশিংটন।
তবে বর্তমানে চীন এসব খনিজের প্রধান আমদানিকারক হওয়ায় মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ানোর উদ্যোগকে বেইজিং কীভাবে নেবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন মিয়ানমারের নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে থাকা সম্পদ আটকে দেয় এবং দেশটির সামরিক কর্মকর্তাদের ও সামরিক বাহিনী-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।


