রাজধানী ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার। বিদেশ থেকে আগত একজন যাত্রী বিমান থেকে নামার পরই এই বিমানবন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁর প্রথম ধারণা তৈরি করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই প্রথম ধারণাটি আজ নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় ভরে উঠছে—প্রবেশপথের যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা, ট্রলি-লাগেজের সংকট, কার্গো ভিলেজে বারবার অগ্নিকাণ্ড এবং সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা। এসব অভিযোগ মোটেই অমূলক নয়; বরং প্রতিদিনের ব্যবহারকারীরা এসব সমস্যার সরাসরি সাক্ষী।
প্রথমত, বিমানবন্দরে প্রবেশের প্রধান সড়কটিই যেন এক দুঃস্বপ্ন। তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত পার্কিং এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে মাত্র কয়েকশো মিটার পথ পাড়ি দিতেও অনেক সময় নষ্ট হয়। কোনো যাত্রী যদি রাস্তায় আটকে পড়েন, তবে নির্ধারিত সময়ে চেক-ইন কাউন্টারে পৌঁছানো তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। অথচ সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তা এবং দক্ষ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে এই সমস্যার সহজেই সমাধান সম্ভব। বিমানবন্দরের সামনের রাস্তা কেবল যাতায়াতের পথ নয়; এটি একটি দেশের সভ্যতা ও দক্ষতার প্রতিচ্ছবি।
দ্বিতীয়ত, যাত্রীদের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন হলো ট্রলি বা লাগেজ বহনের সরঞ্জাম। সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত ট্রলি না পাওয়া কেবল ভোগান্তির নয়, বরং ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ। একজন যাত্রী যখন ব্যাগ টানতে টানতে হয়রান হন, তখন তিনি বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ সম্পর্কে যে ধারণা লাভ করেন, তা কখনোই ইতিবাচক হতে পারে না, আর বিদেশী হলে তো পুরো দেশ সম্পর্কেই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। অথচ বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরগুলোতে যাত্রীসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিক ও ইঞ্জিনিয়াররা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন; কিন্তু আমাদের নিজস্ব বিমানবন্দরে সেই মান বজায় রাখা যাচ্ছে না—এটি অবশ্যই নেতৃত্বের অভাবেরই ফল।
তৃতীয়ত, কার্গো ভিলেজে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশে ইতোমধ্যে নানা নিরাপত্তা সংকট বিদ্যমান; তার ওপর প্রধান বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। অথচ উন্নত দেশের বিমানবন্দরগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এতটাই আধুনিক ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত যে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও বিরল। এখানে ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ডের অর্থ হলো নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গলদ এবং তদারকির অভাব।
চতুর্থত, পরিচ্ছন্নতা ও যাত্রীসেবার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর মানেই পরিচ্ছন্ন টার্মিনাল, সুশৃঙ্খল ভিড় ব্যবস্থাপনা এবং ভদ্র ও প্রশিক্ষিত কর্মী। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা প্রায়ই উল্টো। যাত্রীদের অহেতুক ঝামেলার শিকার হতে হয়। লাগেজ কাঁটা বা হারিয়ে যাওয়া যে একজন বিদেশ ফেরত শ্রমিকের জন্য কতটা ব্যথার সেটা কে বুঝবে? অথচ সঠিক পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতা থাকলে এগুলো এড়ানো সম্ভব।
প্রতিকারের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বিমানবন্দরের প্রবেশপথে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত পার্কিং চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত ট্রলি ও লাগেজ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, কার্গো এলাকায় কঠোর অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ম ও নিয়মিত মহড়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, পরিচ্ছন্নতা ও যাত্রীসেবায় দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পঞ্চমত, পুরো ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার,জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে দায়িত্বহীনতা ধরা পড়ে এবং শাস্তির আওতায় আসে।
সবশেষে বলা যায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলাদেশের মুখ। এই মুখ যদি কালিমালিপ্ত হয়, তবে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই দ্রুত সংস্কার, দক্ষ নেতৃত্ব এবং যাত্রীবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিমানবন্দরকে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। অন্যথায় বিদেশি যাত্রীর কাছে বাংলাদেশের প্রথম পরিচয় হয়ে থাকবে বিশৃঙ্খলা আর অব্যবস্থাপনার এক বিষণ্ন চিত্র। আর দেশের মানুষের কাছে পরিচিত হতে থাকবে না বদলানোর দায়। সরকার যায়, সরকার আসে, কিন্তু ইতিবাচক পরিবর্তন আসে না। আমরা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সহ দেশের সব বিমানবন্দরের যথোপযুক্ত বা পেশাদারিত্ব নেতৃত্ব চাই।
লেখক: নাহিদ হোসেন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ


