মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও জ্বালানি সংকট আপাতত সামাল দিতে পেরেছে বাংলাদেশ। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ধরে রাখা দিন দিন বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে।
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুত আছে, তা দিয়ে আগামী দুই মাস চলা যাবে। আর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির মজুত দিয়ে ৪৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব।
তবে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধুদেশগুলোর কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়ার প্রধান পথগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে সরকারকে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যেখানে জ্বালানির দাম সারাক্ষণ ওঠানামা করে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আপৎকালীন সংকট থেকে বাঁচতে সরকার এখন এমন একটি স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করবে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর জ্বালানি আমদানি করতেই বাংলাদেশের প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যায়, যা দেশের মোট জিডিপির ৪ শতাংশেরও বেশি। কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানির পেছনে এই বিপুল খরচের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং কলকারখানার উৎপাদন যেকোনো সময় বড় ধরনের আন্তর্জাতিক ধাক্কার মুখে পড়তে পারে।
মূলত আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণেই বিশ্ববাজারের সামান্য ওলটপালটও দেশের জ্বালানি খাতকে নাজুক করে তোলে।
বাংলাদেশ বর্তমানে পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মেটানো হয় আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে, যা কাতারএনার্জি এবং ওমানের ওকিউ ট্রেডিংয়ের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হয়।
অন্যদিকে, দেশের প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল পুরোটাই আসে সৌদি আরামকো এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে। এমনকি বাসাবাড়ি ও গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির ক্রমবর্ধমান বাজারটিও সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার এবং আরব আমিরাতের আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
চিন্তার বিষয় হলো, এই সমস্ত জ্বালানি আমদানির জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি পার হয়ে আসতে হয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সামুদ্রিক পথটি দীর্ঘদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে জ্বালানি আসার পথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কররেশনের (বিপিসি) সূত্র নিশ্চিত করেছে, এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি জাহাজ এখনো পারস্য উপসাগরে আটকে আছে। সংকট এড়াতে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরসহ বিকল্প পথ দিয়ে কিছু জাহাজ ঘুরিয়ে আনা হচ্ছে, যা পুরো ব্যবস্থাপনা ও জাহাজ চলাচলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দর থেকে রওনা হওয়া একটি তেলের জাহাজ সময়মতো চট্টগ্রাম পৌঁছাতে পারেনি। এর ফলে চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগারটি (ইস্টার্ন রিফাইনারি) গত ৫ মে তেল খালাসের আগে প্রায় ২০ দিন পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
একইসঙ্গে জাহাজ ভাড়া এবং পরিবহন খরচও অনেক বেড়ে গেছে। বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে কিছু কিছু রুটে জাহাজের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এটি সরকারের জ্বালানি কেনার বাজেটকে ভীষণ চাপের মুখে ফেলেছে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে বৈচিত্র্য আনতে বাংলাদেশ এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অন্য দেশের সন্ধান করছে। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে সরাসরি (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে তেল ও গ্যাস কেনার চেষ্টা চলছে।
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি চুক্তি রয়েছে। তবে কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প কোনো দেশের সঙ্গে এখনো স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি চূড়ান্ত করা যায়নি।
খোলা বাজারের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা
উপসাগরীয় অঞ্চলের এই অশান্তি এলএনজি আমদানির ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে। ফলে কাতার ও ওমানের সঙ্গে করা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো এখন প্রায় অচল। পেট্রোবাংলার দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, হরমুজ প্রণালির সমস্যার কারণে চুক্তি অনুযায়ী কাতার বা ওমান থেকে এলএনজির জাহাজ আসতে পারছে না। এর ফলে বছরে প্রায় ১০৫টি এলএনজি কার্গো বা জাহাজ আমদানির যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ছিল, তা এখন আংশিকভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা স্পট মার্কেট থেকে চুক্তি মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ দাম দিয়ে এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ।
আগে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এলএনজি’র প্রতি ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) দাম যেখানে ছিল ১০ ডলার, এখন খোলা বাজারে তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ২০ ডলারে। এতে সরকারের ওপর খরচের বিশাল বোঝা চাপছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এরফানুল হক টাইমস’কে জানান, একটিমাত্র সরবরাহ রুটের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি উৎসে বৈচিত্র্য আনতে তারা বর্তমানে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কথাবার্তা বলছেন।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্যাস মজুত আছে তা দিয়ে আগামী জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশের চাহিদা মেটানো যাবে। খুব দ্রুত আরও একটি বাড়তি চালানের জাহাজ দেশে আসবে, যা সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দিতে সাময়িক কিছুটা স্বস্তি দেবে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব
গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের মোট আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের শতভাগ, এলএনজির ৭১ শতাংশ এবং পরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ এই রুট দিয়েই দেশে আসে। বাংলাদেশ বছরে ১১৫টিরও বেশি এলএনজির জাহাজ আমদানি করে থাকে। কেবল মে মাসের জন্যই ১১টি চালানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যার সিংহভাগই এখন খোলা বাজার থেকে চড়া মূল্যে কিনতে হচ্ছে।
এরই মধ্যে বিপিসি উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে জেট ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল এবং পেট্রোল আমদানির জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার ডেকেছে। এলপিজি আমদানির জন্যও আলাদা টেন্ডার দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তেলের টেন্ডারে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ভালো সাড়া পাওয়া গেলেও এলপিজির টেন্ডারে সাড়া মিলেছে খুবই কম। তাই সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলপিজির জন্য আবারও নতুন করে টেন্ডার ডাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত এখন আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৩ থেকে ৪৯ শতাংশ আসে গ্যাস এবং এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্রের মজুত ক্রমাগত ফুরিয়ে আসায় আমদানিকৃত এলএনজি একাই এখন জাতীয় গ্যাসের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পূরণ করছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া মূল্য ও উৎপাদন খরচের কারণে দেশে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে মাত্র ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বর্তমানে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, সেখানে ডিজেল থেকে আসছে মাত্র ২৯০ মেগাওয়াট।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, অতি দ্রুত জ্বালানি আমদানির নতুন নতুন উৎস খুঁজে বের না করলে এবং নিরাপদ দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি নিশ্চিত করতে না পারলে বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।


