মোটরসাইকেলে অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব, বিপাকে চালকরা

মোটরসাইকেলে অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব, বিপাকে চালকরা
রাজধানীর একটি সড়কের পাশে মোটরসাইকেল থামিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন দুই রাইডার। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

মোটরসাইকেলে অগ্রিম কর (এআইটি) আরোপের পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। উবার, পাঠাওয়ের চালকসহ যেসব ব্যক্তি নিজের মোটরসাইকেলে ‘রাইড শেয়ারিং’ করে সংসার চালান, তাদের ওপরও এই অগ্রিম কর বসবে। অগ্রিম কর মানে কোনো ব্যক্তির করযোগ্য আয় হবে ধরে নিয়ে তার কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে নেওয়া।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিসিভেদে (ইঞ্জিনক্ষমতা অনুযায়ী) মোটরসাইকেলে দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম কর আরোপ করা হতে পারে। এখন দেশে করমুক্ত বার্ষিক আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা। অর্থাৎ, এর চেয়ে বার্ষিক আয় বেশি হলে আয়কর দিতে হয়। তবে দেশে বহু মোটরসাইকেলচালক আছেন, যাদের করযোগ্য আয় নেই। তাদের কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই এবং বছর শেষে আয়কর রিটার্নও জমা দিতে হয় না।

অনেকে পরিবার সহজে যাতায়াতের জন্য সন্তানকে মোটরসাইকেল কিনে দেন। তাদের অনেকে টিউশনের টাকা বা অস্থায়ী কাজের আয় দিয়ে বাইকের খরচ চালান। এ ছাড়া, অনেক ডেলিভারিম্যান (পণ্য সরবরাহকারী) নিজের মোটরসাইকেলে এই সেবা দিয়ে থাকেন। এমনকি গ্রামগঞ্জেও অনেকে মোটরসাইকেল চালান। তাদের বিশাল একটি অংশ করজালের আওতার বাইরে আছে, যাদের এখন অগ্রিম কর দিতে হতে পারে।

এনবিআরের আয়কর নীতি বিভাগের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম জানান, মোটরসাইকেলে অগ্রিম আয়কর আরোপ রাজস্বের দিক থেকে যৌক্তিক এবং এতে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে চলে গেছে। সরকারের কর সংগ্রহ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে, মোটরসাইকেলচালক এবং উদ্যোক্তারা বলছেন, করযোগ্য আয় না থাকা মানুষের কাছ কাছ থেকে অগ্রিম আয়কর নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। সরকার যদি শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নেয়, সেটা অনেকটা জোর করে টাকা নেওয়ার মতো হবে।

কর কত হতে পারে

আসন্ন (২০২৬-২৭) অর্থবছরের বাজেটে করসংক্রান্ত প্রস্তাব নিয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন এনবিআর কর্মকর্তারা। ওই বৈঠকে মোটরসাইকেল মালিকদের করের আওতায় আনা নিয়ে আলোচনা হয়। নতুন প্রস্তাবে ১১০ সিসি ক্ষমতার মোটরসাইকেলে অগ্রিম কর দিতে হবে না। ১১১ থেকে ১২৫ সিসি ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলে বার্ষিক কর দুই হাজার টাকা হতে পারে। ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত পাঁচ হাজার এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলে ১০ হাজার টাকা অগ্রিম কর বসতে পারে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেল ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮০টি। যানবাহনের ক্ষেত্রে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, জিপ, পিকআপ, বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের মালিকদের অগ্রিম কর দিতে হয়। এসব যানবাহনমালিকের কাছ থেকে বছরে যানবাহনপ্রতি দুই হাজার ৫০০ থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম কর নেওয়া হয়, যা চূড়ান্ত কর দায়। যানবাহনমালিকের করযোগ্য আয় না থাকলেও তা আর ফেরত দেওয়া হয় না।

মোটরসাইকেলমালিকদের বর্তমানে এই অগ্রিম কর নেই। এখন অগ্রিম কর বসালে অন্য যানবাহনমালিকদের মতো স্বাভাবিকভাবেই তা চূড়ান্ত কর দায় হিসেবেই আরোপিত হবে। ফলে মোটরসাইকেলমালিকদের করযোগ্য আয় না থাকলেও তাদের বাধ্য হয়ে এই অগ্রিম কর দিতে হবে।

সিসি কী এবং মোটরবাইকের সঙ্গে এর সম্পর্ক

সিসির পূর্ণরূপ হলো কিউবিক সেন্টিমিটার বা কিউবিক ক্যাপাসিটি (ঘন সেন্টিমিটার)। সহজে বললে সিসি হলো মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের সিলিন্ডারে ফাঁকা জায়গার আয়তন। ইঞ্জিনের ভেতরে একটি পিস্টন ওঠানামা করে। পিস্টন সিলিন্ডারের ভেতরে যতটুকু জায়গায় ওঠানামা করে, সেই আয়তনই হলো সিসি। সিলিন্ডারের এই ফাঁকা জায়গায় জ্বালানি (পেট্রল বা অকটেন) এবং বাতাসের মিশ্রণ প্রবেশ করে। এরপর স্পার্ক প্লাগের মাধ্যমে স্ফূলিঙ্গে (স্পার্ক) বিস্ফোরণ ঘটে। এই বিস্ফোরণের ধাক্কায় পিস্টন নিচে নামে এবং সেই শক্তি চাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর কারণে গাড়ি চলতে শুরু করে।

ইঞ্জিনের সিসি যত বেশি হবে, সিলিন্ডারে তত বেশি জ্বালানি ও বাতাস প্রবেশের জায়গা থাকবে। যত বেশি জ্বালানি পুড়বে, বিস্ফোরণও তত শক্তিশালী হবে। এর ফলে ইঞ্জিন বেশি হর্সপাওয়ার (বাইকের গতি) এবং বেশি টর্ক (বাইকের পিকআপ) উৎপন্ন করবে। তবে সিসির সঙ্গে মাইলেজের সম্পর্ক বিপরীতমুখী। অধিক সিসির ইঞ্জিনের সিলিন্ডার বড় বলে বিস্ফোরণে বেশি জ্বালানি লাগে। অর্থাৎ সিসি যত বাড়বে, বাইকের জ্বালানি খরচ তত বাড়বে। অন্যদিকে, কম সিসির ইঞ্জিনে সিলিন্ডার ছোট হওয়ায় জ্বালানি খরচ কম হয় এবং বেশি মাইলেজ পাওয়া যায়।

সিসিভেদে মোটরসাইকেলের প্রকারভেদ

বাংলাদেশে চলাচলের ধরন এবং ক্রেতাদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বাইকগুলোকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়:

  • কমিউটার সেগমেন্ট (৮০-১২৫ সিসি): এই মোটরসাইকেলগুলো কম খরচে যাতায়াতের উদ্দেশ্যে বানানো। এগুলোর ডিজাইন বেশ সাদামাটা হয় এবং ওজন কম থাকে। উদাহরণস্বরূপ–বাজাজ সিটি ১০০, হোন্ডা লিভো, টিভিএস মেট্রো, হিরো স্প্লেন্ডার।
  • স্ট্যান্ডার্ড বা এক্সিকিউ সেগমেন্ট (১৩৫-১৬০ সিসি): বাংলাদেশে এই ক্যাটাগরির মোটরসাইকেল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এসব বাইকে পাওয়ার, স্টাইল এবং মাইলেজ–তিনের চমৎকার সমন্বয় থাকে। উদাহরণ–বাজাজ পালসার ১৫০, ইয়ামাহা এফজেড-এস, সুজুকি জিক্সার, টিভিএস অ্যাপাচি আরটিআর, ইয়ামাহা আর১৫, এমটি-১৫ ইত্যাদি।
  • স্পোর্টস, ক্রুজার এবং প্রিমিয়াম সেগমেন্ট (১৬৫-৩৫০ সিসি): এই ক্যাটাগরির বাইক মূলত স্পিড, লং ট্যুর, হাইওয়ে ক্রুজিং এবং রেসিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই বাইকগুলোতে লিকুইড কুলিং, ফুয়েল ইনজেকশন, ডুয়াল-চ্যানেল এবিএসের মতো আধুনিক প্রযুক্তি থাকে। উদাহরণ–হোন্ডা সিবিআর২৫০আরআর, পালসার এন২৫০, রয়্যাল এনফিল্ড ইত্যাদি।
Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad