নওগাঁর দুবলহাটির ইতিহাসে আস্তান মোল্লা এক বিস্ময়কর নাম। একজন সাধারণ কৃষক হয়েও তিনি সাহসিকতা ও নেতৃত্বের মাধ্যমে নির্যাতিত মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন। সময়ের স্রোতে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত হলেও নওগাঁর মানুষের হৃদয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দুবলহাটি জমিদারির প্রজারা চরম দুর্বিষহ জীবনযাপন করতেন। অতিরিক্ত খাজনা আদায়, জোরপূর্বক ফসল ও গৃহপালিত পশু কেড়ে নেওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। স্থানীয় জনশ্রুতি মতে, জমিদারের লোকজন সুন্দরী নারীদের অপহরণও করত। এই অন্ধকার সময়ে হাঁসাইগাড়ী গ্রামের আস্তান মোল্লা কৃষকদের পাশে দাঁড়ান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একার প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।
১৮৯৩ সালে আস্তান মোল্লার নেতৃত্বে ৫০টি গ্রামের ৫০ হাজার কৃষক জমিদারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন। দীর্ঘ সাত বছর চলে এই আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত জমিদার খাজনা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। নওগাঁর ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষক আন্দোলন।
আস্তান মোল্লা আইনি পথেও কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। ১৯৩২ সালে নওগাঁ আদালতে তিনি ‘শান্তি মামলা’ নামে একটি মামলা করেন। তদন্তে কৃষকদের দাবি যৌক্তিক প্রমাণিত হয়। এরপর জমিদারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। লোকশ্রুতি আছে, রাজা হরনাথ রায়চৌধুরী এলাকা ছেড়ে চলে যান ও স্থায়ীভাবে আর ফিরে আসেননি। এ থেকেই জন্ম নেয় প্রবাদ—‘প্রজার ভয়ে রাজা নিরুদ্দেশ।’
একবার জমিদারের আত্মীয় শশীভূষণ মাদী ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে যাচ্ছিলেন। আস্তান মোল্লা তাকে প্রকাশ্যে প্রশ্ন করেন, ‘প্রজাদের মাদী গরু দিয়ে হালচাষ নিষিদ্ধ, অথচ আপনি মাদী ঘোড়ায় চড়ে চলছেন কীভাবে?’ এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রশ্নে শশীভূষণ কোনো উত্তর না দিয়ে সরে যান। ঘটনাটি সে সময় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
১৯৩১ সালের ভয়াবহ বন্যায় বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। জমিদারের ভয়ে কেউ বাঁধ কাটার সাহস করেনি। আস্তান মোল্লা মহকুমা প্রশাসক অন্নদাশঙ্কর রায়কে সঙ্গে নিয়ে কৃষকদের সহযোগিতায় বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেন। প্রশাসক নিজেই নতুন বাঁধ নির্মাণের উদ্বোধন করেন।
১৮৫০ সালে সদর উপজেলার হাঁসাইগাড়ী গ্রামে আস্তান মোল্লা জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আসফদি মোল্লা। সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত আস্তান মোল্লা খালি পায়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কৃষকদের সংগঠিত করতেন। ১৯৪০ সালে ৯০ বছর বয়সে তিনি সদর হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার অবদান স্মরণে ১৯৯২ সালে শহরে ‘আস্তান মোল্লা কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে আড়াই হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
নওগাঁ চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘তিনি ছিলেন প্রজাদের প্রকৃত বন্ধু। কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার অবদান চিরস্মরণীয়।’
প্রবীণ লেখক আতাউল হক সিদ্দিকীর মতে, ‘আস্তান মোল্লা ছিলেন সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি। তাঁর সাহস, সততা ও নেতৃত্ব নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।’
স্থানীয় সংগঠন একুশে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এম. এম. রাসেল মনে করেন, দুবলহাটির গোয়ালী থেকে কাঠখৈইর পর্যন্ত সড়কের পাশে আস্তান মোল্লার জীবনীসংবলিত একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার সংগ্রাম সম্পর্কে জানতে পারবে।


