১৯৭১-এর ইতিহাস বদলানোর চেষ্টায় ভারত-পাকিস্তান: বাংলাদেশ কি মুখ খুলবে?

১৯৭১-এর ইতিহাস বদলানোর চেষ্টায় ভারত-পাকিস্তান: বাংলাদেশ কি মুখ খুলবে?
Advertisement
Advertisement

দীর্ঘকাল ধরে ভারত-ঘেঁষা ও পাকিস্তান-ঘেঁষা—এই দুই বিপরীতমুখী বয়ানে প্রভাবিত হয়ে আসছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। কিন্তু সম্প্রতি সামরিক বাহিনী-সংশ্লিষ্ট দুটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এই পুরনো উত্তেজনাকে নতুন করে জনগণের সামনে এনেছে। এর মধ্যে একটি পোস্টে ভারতের ইস্টার্ন কমান্ড ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বিজয়কে কেবল ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের ফল হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর একটি পোস্টে ১৯৭১ সালের নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত সৈন্যদেরকে ‘নায়ক’ হিসেবে জাহির করা হয়েছে।

তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন, এর চেয়েও বেশি বিস্ময়কর হলো বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নীরবতা। তাদের যুক্তি, এই নীরবতা শুধু কৌশলগত সাবধানতা নয়, বরং দেশের নিজস্ব জাতীয় বয়ানের প্রতি গভীর উদাসীনতারও প্রতিফলন।

হার্ভার্ড ও লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স এবং স্বাধীন গণহত্যা গবেষকসহ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বরাবরই ১৯৭১ সালের যুদ্ধকে জনযুদ্ধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তারা একে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার জন্য একটি জনগণতান্ত্রিক অভ্যুত্থান হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু ভারতের ইস্টার্ন কমান্ড সম্প্রতি এই সংঘাতকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের একটি কৌশলগত বিজয় হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। সামরিক ইতিহাসবিদরা এমন কাজকে ‘জনগণের যুদ্ধের উপর রাষ্ট্রের দখল’ বলে থাকেন। যেখানে গণআন্দোলনের ইতিহাস থেকে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে সরিয়ে কোনো রাষ্ট্র বা বিদেশী শক্তির বিজয়ের কাহিনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এই প্রবণতা আগেও দেখা গেছে। ভারতের সামরিক ইতিহাসে প্রায়শই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে নয়াদিল্লির আঞ্চলিক কৌশলগত অর্জনের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। সমালোচকরা বলছেন, এত স্পষ্টভাবে এই ধরনের কথা বলা বাংলাদেশের নিজস্ব স্বাধীনতার ইতিহাসের ওপর তার সার্বভৌম অধিকারকে দুর্বল করে দিতে পারে।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক পোস্টটি আরও বেশি আপত্তিকর। তারা বহু দশকের আন্তর্জাতিক গণহত্যা গবেষণার সরাসরি বিরোধিতা করেছে। অসংখ্য গবেষণা, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং মানবাধিকার তদন্ত বারবার ১৯৭১ সালের নৃশংসতাকে ‘সুপরিকল্পিত গণহত্যা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর বিপরীতে, পাকিস্তানের সামরিক বর্ণনায় বাংলাদেশে নিহত তাদের সৈন্যদের শহীদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু মুজিবের প্রতি অপমান নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বৈধতাকেই অস্বীকার করার একটি চেষ্টা।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশ্যে এ দু’টি পোস্টের কোনো জবাব না দেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে যে, এখন ইতিহাসের রাজনীতির চেয়েও পররাষ্ট্রনীতির হিসাব-নিকাশ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে কিনা। বিশ্লেষকরা এর পেছনে তিনটি সম্ভাব্য কারণ দেখিয়েছেন:

আরও পড়ুন

১. কূটনৈতিক বিবেচনা: অতিসম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লেনদেন এবং নিরাপত্তা সংলাপের মতো বিষয়গুলোয় অগ্রগতি হওয়ায় সরকার হয়তো সতর্ক থাকতে চাইছে। একই সঙ্গে, ভারতের সামরিক বার্তার বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রেও নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে।

২. নির্বাচনী স্পর্শকাতরতা: ভারত বা পাকিস্তান নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিলে জনসমর্থনের ভিত্তি বিভক্ত হয়ে যেতে পারে বলে ভয় পাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। কারণ জনগণ এখনও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বিভাজন রেখা অনুযায়ী বিভক্ত।

৩. জাতীয় বয়ানে দুর্বলতা: বাংলাদেশে ১৯৭১-এর ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরে গভীরভাবে রাজনীতিকরণের শিকার হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, স্বাধীন গবেষণা এবং নাগরিক শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় বাইরের বয়ানগুলো অস্বাভাবিকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। কেউ কেউ এটিকে ‘জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের শূন্যতা’ বলে অভিহিত করেন। যখন কোনো জাতির নিজস্ব অতীত বর্ণনা দুর্বল হয়ে যায়, তখন রাজনৈতিক নেতারা নীরব থাকাকেই সুবিধাজনক মনে করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন এখনও একটি স্পষ্ট ‘বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক’ অবস্থান তৈরি করতে পারেনি, যা ভারত বা পাকিস্তানের প্রতি পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। এর ফলে, সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিতর্কগুলো বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্যের বদলে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রবণতার সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি রয়েছে। যদি ১৯৭১-এর ব্যাখ্যা বাইরের শক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হতে থাকে, তবে তা ঢাকার কূটনৈতিক ক্ষমতা এবং সম্মিলিত জাতীয় পরিচয়ের অনুভূতি—উভয়কেই ধীরে ধীরে ক্ষয় করে দিতে পারে।

অনেক বিশ্লেষকের কাছে, বর্তমানের নীরবতা কেবল দুটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের প্রতি সাড়া দিতে ব্যর্থতা নয়। এটি একটি গভীর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে: বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশ তার ইতিহাস এবং সার্বভৌমত্বকে কতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে পারে?

তাঁরা জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো কূটনৈতিক উপহার বা বাইরের কোনো শক্তির ছাড়ের ফল ছিল না। এটি ছিল সাধারণ জনগণের ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধের ফসল। যদি সেই ইতিহাস বাইরের গল্পে ম্লান হয়ে যায় এবং দেশের রাজনৈতিক নেতারা তার প্রতিবাদ না করেন—তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ১৯৭১-কে এমনভাবে জানবে যা বাংলাদেশিদের চেয়ে প্রতিযোগী আঞ্চলিক শক্তিগুলোই বেশি প্রভাবিত করবে।

অতএব, মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিতই থেকে যায়: বাংলাদেশ কি তার নিজস্ব বয়ান সংজ্ঞায়িত করে ইতিহাস রক্ষা করবে? নাকি তার দুই শক্তিশালী প্রতিবেশীর দেওয়া বয়ানের মাঝখানে চলতে থাকবে? ভারত বা পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে যুক্ত একটি রাজনৈতিক পরিবেশে বিশ্লেষকরা জানতে চান—কারা এই ‘ সবার আগে বাংলাদেশ’ অবস্থানটি গ্রহণ করবেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad