এক ভবন, দুই বাস্তবতা: পাসপোর্ট পাওয়া সহজ, ভিসার জন্য ‘ঘুষ’

এক ভবন, দুই বাস্তবতা: পাসপোর্ট পাওয়া সহজ, ভিসার জন্য ‘ঘুষ’
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

ডিজিটাল ব্যবস্থা আর কড়া নজরদারির কারণে ঢাকার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসের সেবার মান এখন আগের চেয়ে অনেক ভালো। মানুষ এখন আগের মতো দালাল বা হয়রানির অভিযোগ তেমন একটা করছেন না। কিন্তু এই ভবনেরই ঠিক পাজশেই যেখানে ভিসার কাজ হয়, সেখানকার অবস্থা পুরো উল্টো। সেখানে সেবা নিতে আসা মানুষের অভিযোগ, ঘুষ ছাড়া সহজে কাজ হয় না।

আগারগাঁওয়ের এই বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে আসা ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যাংকে সরকারি ফি জমা দিয়ে সব নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও ভিসা পেতে দেরি হয়। যতক্ষণ না কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীকে ‘চা-পানির খরচ’ বা বাড়তি টাকা দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ ফাইল সহজে নড়ে না।

এই চিত্রের সঙ্গে দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মিল রয়েছে। টিআইবি জানিয়েছে, দেশের সরকারি সেবাগুলোর মধ্যে পাসপোর্ট ও ভিসা অফিস এখনো অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। তাদের জরিপ অনুযায়ী, পাসপোর্ট ও ভিসার কাজে যাওয়া ৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারকে কোনো না কোনোভাবে ঘুষ দিতে হয়েছে।

গত রোববার ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে এই অফিস ঘুরে দেখা গেছে, ভিসা শাখার ভেতরে বেশ কিছু মানুষ অবাধে ঘোরাঘুরি করছেন। তারা ভিসা আবেদনকারী নন, আবার অফিসের কর্মচারীও নন। তারা টাকার বিনিময়ে দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার জন্য মানুষকে ফিসফিস করে প্রস্তাব দিচ্ছেন। সোজা কথায় তারা ‘দালাল’।

সেখানে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। একজন চীনা নাগরিক এসেছেন তার ভিসার মেয়াদ বাড়াতে। তিনি বাংলা বা ইংরেজি কোনোটিই বলতে পারেন না, তাই মোবাইলের ট্রান্সলেশন অ্যাপ দিয়ে অফিসের লোকজনকে নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু অফিসের কোনো কর্মকর্তা তাকে একটুও সাহায্য করেননি। উল্টো তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ভবনের নিচে রাস্তার পাশে একটি অস্থায়ী কম্পিউটারের দোকানে।

একটি বড় ছাতার নিচে ল্যাপটপ আর প্রিন্টার নিয়ে বসা সেই দোকানদার ওই বিদেশি নাগরিককে বললেন, ‘অফিসের সময় প্রায় শেষ। তবে বাড়তি পাঁচ হাজার টাকা দিলে আজকেই ভিসা করিয়ে দেওয়া যাবে।’

বাইরের একজন সাধারণ দোকানদার হয়েও কীভাবে ভিসার ব্যবস্থা করবেন— টাইমসের এমন প্রশ্নের জবাবে ওই লোক বেশ সহজভাবেই বললেন, ‘উপরে আমাদের লোক আছে। টাকা দিলে সব কাজই সম্ভব।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন ভিসা আবেদনকারী জানান, কাউন্টারে ফাইল জমা দেওয়ার সময় তিনি ভেতরেই কিছু বাড়তি টাকা গুঁজে দিয়েছিলেন, যাতে কাজটা দ্রুত হয়ে যায়।

আরও পড়ুন

অনেকের মতে, এই অফিসে ইচ্ছা করেই কাজ আটকে রাখা হয়, যাতে বাধ্য হয়ে মানুষ টাকা দিতে রাজি হয়।

সোহেল আখতার নামে এক ব্যক্তি একটি বেসরকারি প্রজেক্টে কর্মরত বিদেশি কর্মকর্তার ‘অন-অ্যারাইভাল ভিসা’ নবায়ন করতে এসেছিলেন। সব নিয়ম মানার পরও তাকে দিনের পর দিন ঘোরানো হচ্ছিল। সোহেল জানান, তিনি গত ২৭ জুন আবেদন করেন এবং তার পরের দিনই পুলিশের ক্লিয়ারেন্স পান। নিয়ম অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভিসা হওয়ার কথা থাকলেও নয় দিন পরও তিনি অফিসের বারান্দায় ঘুরছিলেন। সরকারি ফি বাবদ ১০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তার কাছে আলাদা করে আরও ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়।

সোহেল বলেন, ‘প্রথম দিনই টাকাটা দিলে সেদিনই কাজ হয়ে যেত। আমি অন্যায় টাকা দিইনি বলেই আজ আমাকে এভাবে ভুগতে হচ্ছে।’

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে ভিসা অফিসের উপ-পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি লিখিত প্রশ্ন জমা দিতে বলেন। পরে তার সরকারি ফোনে কল করা হলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পাসপোর্ট অফিসের আলাদা চিত্র

ভিসা অফিসের এই হাহাকারের ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেল পাশের পাসপোর্ট শাখায়। সেখানে অনলাইন আবেদন আর ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কারণে দালালের উপদ্রব এখন প্রায় নেই বললেই চলে। তবে যারা একদমই নিয়ম না মেনে খুব জরুরি ভিত্তিতে পাসপোর্ট চান, তারা এখনো চেনা-জানা মাধ্যমে বাড়তি টাকা খরচ করছেন।

যেমন মোক্তার হোসেন নামের এক আবেদনকারী জানান, পরের দিনই তার একটি চাকরির ইন্টারভিউ ছিল। তাই তিনি ঝামেলার নিয়ম এড়িয়ে পরিচিত একজনের মাধ্যমে কিছু বাড়তি টাকা খরচ করে দ্রুত পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন।

তবে সাধারণ নিয়ম মেনে যারা অনলাইনে আবেদন করেছেন, তারা কোনো বাড়তি টাকা ছাড়াই সময়মতো পাসপোর্ট পাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাকিল হোসেন জানান, তার বাবা অনলাইনে সব কাজ করেছেন। কোনো বাড়তি টাকা বা ঝামেলা ছাড়াই মাত্র তিন দিনে তিনি পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন।

তাছাড়া যারা ডিজিটাল ফর্ম পূরণ করতে পারেন না, তাদের জন্য অফিসের বাইরে এখন ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। তারা মাত্র ২০০ টাকার বিনিময়ে ফর্ম পূরণ করে দেয়। ফলে আগের সেই বড় দালালের খপ্পরে মানুষকে পড়তে হচ্ছে না। এমনকি সাবধানতার জন্য পাসপোর্ট অফিস কর্তৃপক্ষ বাইরে কিছু চিহ্নিত দালালের ছবিও টাঙিয়ে রেখেছে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

পাসপোর্ট অফিসের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ঢাকার একটি অফিসে ভালো সেবা দিলেই পুরো দেশের চিত্র বদলাবে না।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকায় দুই-একটি অফিসে সেবার মান একটু বাড়লেই খুশি হওয়ার কারণ নেই। ঢাকার বাইরের মানুষ এখনো পাসপোর্টের জন্য চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দেশের সব পাসপোর্ট অফিসে এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।’

টিআইবির আরেক কর্মকর্তা নূর-ই-আলম মিল্টন জানান, তাদের তথ্য অনুযায়ী সিলেট ও বরিশাল অঞ্চলে পাসপোর্টের ক্ষেত্রে দুর্নীতির হার সবচেয়ে বেশি-প্রায় ৯০ শতাংশ। তিনি পরামর্শ দেন, বাইরের ছোটোখাটো ফর্ম পূরণের দোকানগুলোকে যদি সরকারি অনলাইন কাঠামোর মধ্যে এনে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায়, তবে মানুষ আর দালালের কাছে যাবে না।

তবে টিআইবির এই রিপোর্টের ব্যাপারে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. নুরুল হাফিজ কোনো মন্তব্য করতে চাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারি অফিসে শতভাগ নিখুঁত সেবা দেওয়া সবসময়ই একটা বড় চ্যালেঞ্জ। একটু-আধটু অভিযোগ সব জায়গাতেই থাকে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর