অবৈধ বিদেশিদের জন্য বাড়ছে অপরাধ

অবৈধ বিদেশিদের জন্য বাড়ছে অপরাধ
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে অবস্থান করা বিদেশি নাগরিকরা জাল টাকা, অনলাইন প্রতারণা ও মাদকের মতো নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রায়ই পুলিশের কাছে অভিযোগ আসছে। রাজধানীর গণ্ডি পেরিয়ে পর্যটন এলাকাগুলোতেও অবৈধ বিদেশিদের তৎপরতা বেড়েছে।

অনেক বিদেশির রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত করতে গিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে উত্তরা, গুলশান ও বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় প্রায়ই অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

অভিযানে অনেকে ধরা পড়লেও জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে নামছেন। অনেকেই সাজা খাটছেন, আবার সাজার মেয়াদ শেষ হলেও নিজ দেশের আগ্রহ না থাকায় কারাগারেই রয়ে গেছেন অনেকে।

আগে আফ্রিকার নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ বেশি থাকলেও এখন চীনা নাগরিকদের অপকর্ম বেশি দেখা যাচ্ছে। তাদের বড় অংশই অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষ বিদেশিদের সহজে বিশ্বাস করে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা প্রতারণা, অনলাইন জুয়া ও জাল টাকার ব্যবসা বেছে নিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, অনলাইন জুয়াসহ নানা অপরাধে জড়িত বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৩৪ হাজার বিদেশি অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। বিভিন্ন কারাগারে বন্দী আছেন প্রায় চারশ জন।

তবে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি জানান, অবৈধ বিদেশিদের বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, অনেক বিদেশি নাগরিক মাদক কারবারে জড়িত। তারা বাংলাদেশে এসে অপরাধের নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন।

আরও পড়ুন

সম্প্রতি উত্তরার একটি বাসায় ল্যাব বানিয়ে কোকেনের মতো মাদক তৈরির সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখান থেকে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ৬ হাজার ৩০০ কেজি কিটামিন উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক, শিক্ষার্থী বা ব্যবসার ভিসায় তারা দেশে ঢোকে। ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও অনেকে থেকে যান এবং পরে অপরাধচক্রে জড়িয়ে পড়েন।

অপরাধের নানা ধরণ

পুলিশের মতে, বিদেশি অপরাধীরা মাদক ছাড়াও জাল ডলার, ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন ক্যাসিনো ও মানব পাচারের মতো অপরাধে যুক্ত।

বিশেষ করে উত্তরা এলাকায় চীনা নাগরিকদের উপদ্রব খুব বেড়ে গেছে। গভীর রাত পর্যন্ত বারে আড্ডা দেওয়া ও বিশৃঙ্খলা করা এখন নিত্যদিনের ঘটনা। অলিগলিতে কয়েকশ চীনা নাগরিককে সন্দেহজনকভাবে ভিডিও বা ব্লগিং করতে দেখে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তারা সেখানে বাসা ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন।

গত ৫ সেপ্টেম্বর উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের বেঙ্গল হোটেল থেকে এক চীনা নাগরিকের লাশ পাওয়া যায়। একই দিনে ৪ নম্বর সেক্টরের মেরিনো হোটেল থেকেও আরেক চীনা নাগরিকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মনসুর জানান, মারা যাওয়া দুই চীনা নাগরিক কবে এবং কেন ঢাকায় এসেছিলেন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে আসার পর পরিচয় গোপন রাখতে অনেকে নিজের আসল পাসপোর্ট নষ্ট করে ফেলে। এরপর অভিজাত এলাকায় হোটেল বা বাসা ভাড়া নিয়ে দেশি চক্রের সাহায্যে অপরাধে নেমে পড়ে।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক মনে করেন, বাংলাদেশে বিদেশিদের চলাফেরায় নজরদারি না থাকার কারণেই অপরাধ ছড়াচ্ছে।

সম্প্রতি কক্সবাজারের একটি রিসোর্ট থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের মধ্যে তাইওয়ানিজ ও চীনা নাগরিক রয়েছে। সেখান থেকে আরও চারজন চীনা নাগরিক পালিয়ে যায়। তদন্তে জানা যায়, তিন শতাধিক চীনা ও তাইওয়ানিজ নাগরিক সেখানে থেকে নানা প্রতারণা চালিয়ে আসছিল।

কারাগারে যত বিদেশি বন্দী

পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১০ আগস্ট পর্যন্ত দুই বছরে ঢাকায় নানা অপরাধে চীনের অন্তত ৫৩ জন নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরই ধরা পড়েছে ২৪ জন। এ ছাড়া খুনের আসামিসহ দেশটির আরও কয়েকজন নাগরিককে খুঁজছে পুলিশ।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী আছেন ৩৯৩ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, ভুয়া লটারি, এটিএম জালিয়াতি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। অনেকে অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে প্রবেশ করায় ধরা পড়েছেন।

কারা দপ্তর জানিয়েছে, বিদেশি বন্দীদের মধ্যে ১৬৭ জনের সাজার মেয়াদ শেষ হলেও নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় তারা কারাগারেই থেকে গেছেন।

অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল টাইমসকে জানান, সাজা শেষ হওয়া বিদেশিদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা রয়েছে।

তিনি আরও জানান, সাজার মেয়াদ শেষ হওয়া বিদেশিদের সেফ হোমে রাখার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেওয়া হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad