পরিপাটি পোশাকের এক ব্যক্তি একটি বেসরকারি ব্যাংকে ঢুকে নিজের চেকের ফরম পূরণ করে দেওয়ার জন্য অন্য একজনের কাছে সাহায্য চাইলেন। তিনি পড়তে বা লিখতে পারেন না জেনে বেশ অবাক হলেন উপস্থিত সবাই।
তবে এ ঘটনা বাংলাদেশের চরম বাস্তবতারই ছবি। এখানে বছরের পর বছর ধরে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানায় সরকার। কিন্তু বাস্তবে কোটি কোটি মানুষ দৈনন্দিন জীবনে পড়া, লেখা ও সাধারণ হিসাব-নিকাশের মতো মৌলিক দক্ষতা ব্যবহারে অক্ষম।
সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, দেশের প্রায় ৭ কোটি মানুষ এখনো ‘কার্যকরভাবে নিরক্ষর’, যা প্রায় ১৮ কোটি মোট জনসংখ্যার ৩৭ শতাংশ। প্রযুক্তি ও মানুষের ক্ষমতার মেলবন্ধন ঘটিয়ে সামাজিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার যে লক্ষ্য নিয়ে ‘পঞ্চম শিল্পবিপ্লব’ এগোচ্ছে, এই পরিসংখ্যান সেই শিল্পবিপ্লবে বাংলাদেশের প্রস্তুত থাকা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এত বিশাল সংখ্যক মানুষকে নিরক্ষর রেখে সরকারের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে একই সংস্থার পরিচালিত ‘ফাংশনাল লিটারেসি অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে’ বা কার্যকর সাক্ষরতা নিরূপণ জরিপে দেখা গেছে, বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় পড়া, লেখা, বোঝা এবং গণনা করতে পারেন মাত্র ৬২ দশমিক ৯২ শতাংশ মানুষ। এটি স্পষ্ট করে, সরকারি হিসাবে যাদের সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন বলে ধরা হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশই কার্যকর সাক্ষরতা অর্জন করতে পারেননি।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘ইউনেসকোর সংজ্ঞায় এটিই আসলে প্রকৃত সাক্ষরতা। একজন মানুষকে সাক্ষর হতে হলে অবশ্যই পড়া, লেখা এবং গাণিতিক হিসাব করতে পারতে হবে।’
সমস্যার তীব্রতা এত বেশি হওয়া সত্ত্বেও কার্যকর সাক্ষরতার বিষয়টি সরকারি নীতিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ পায়নি। ১৯৯০-এর দশকে রাজনৈতিক দলগুলো নিরক্ষরমুক্ত দেশ গড়ার কথা বললেও পরবর্তীতে নির্বাচনী ইশতেহার ও রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে এ বিষয়টি প্রায় হারিয়েই গেছে। এমনকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ নেই।
সরকারি তথ্যমতে, প্রতি বছর সাক্ষরতার হার বাড়ছে মাত্র এক শতাংশীয় পয়েন্টের কাছাকাছি। এই গতিতে চললে পূর্ণাঙ্গ সাক্ষরতা অর্জন করতে বাংলাদেশের প্রায় চার দশক লেগে যাবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সবার জন্য সাক্ষরতা অপরিহার্য। কারণ, যাদের মৌলিক সাক্ষরতার দক্ষতা নেই, তাদের কাছে কার্যকর কারিগরি প্রশিক্ষণ পৌঁছানো সম্ভব নয়। এর ফলে বাংলাদেশ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে, জনগণকে মানবসম্পদে রূপান্তরের বিষয়টি অনেকটাই কেবল কাগজে-কলমে রয়ে গেছে।
সাক্ষরতা থেকে কার্যকর সাক্ষরতা
বাংলাদেশ যখন পঞ্চম শিল্পবিপ্লবে অংশগ্রহণের আলোচনা করছে, তখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন—দেশকে কেবল সাক্ষরতার সংখ্যার ওপর নির্ভর না করে ব্যবহারিক বা কার্যকর দক্ষতার দিকে নজর দিতে হবে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের উপপরিচালক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘ডিজিটাল সেবার ব্যবহার, ওষুধের নির্দেশিকা বুঝতে পারা, ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেন করা, সরকারি ফরম পূরণ করা এবং কর্মক্ষেত্রে লিখিত নির্দেশনা মেনে চলা—এসবই এখন কার্যকর সাক্ষরতার অংশ।’
তিনি বলেন, ‘সাক্ষরতার সংখ্যার যে অগ্রগতি হয়েছে তাকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি পরবর্তী লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ সাক্ষরতা থেকে কার্যকর সাক্ষরতার দিকে এগিয়ে যাওয়া।’
তার মতে, প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বিভিন্ন বয়স ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার ঘাটতি ঠিক কোথায় রয়েছে, তার একটি নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন করা। সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সারা দেশে একই ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ না করে অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক বিশেষ কর্মসূচি চালু করার পরামর্শ দেন তিনি।
সাক্ষরতার ঘাটতি
সাধারণ সাক্ষরতা বলতে বোঝায় কেবল নিজের নাম লিখতে পারা বা সহজ লেখা পড়তে পারা। অন্যদিকে, কার্যকর সাক্ষরতা মেপে দেখে, একজন ব্যক্তি দৈনন্দিন জীবনের তথ্য বুঝতে পারছেন কি না, কার্যকরভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারছেন কি না এবং হিসাব-নিকাশ করতে পারছেন কি না।
২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে পরিচালিত কার্যকর সাক্ষরতা জরিপে সাত বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সের জনগোষ্ঠীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে দেখা গেছে, ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে কার্যকর সাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৯৭ শতাংশ; আর ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার ৬০ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এর আগে ২০১১ সালে ১১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যে পরিচালিত কার্যকর সাক্ষরতা জরিপে এই হার পাওয়া গিয়েছিল ৫৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় কেবল নাম লিখতে পারার ভিত্তিতে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ১৯৭৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে এই হার বেড়ে হয় ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০০১ সালে ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১০ সালে ৫৯ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অনানুষ্ঠানিক ও আজীবন শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘আজীবন শিক্ষার মূল ভিত্তিই হলো সাক্ষরতা। যদি মানুষের কাজের সঙ্গে সাক্ষরতার সম্পর্ক যুক্ত করা যায়, তবেই দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘অর্থনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এটি অর্জন করা সম্ভব হলে জিডিপি, জিএনপি এবং রেমিট্যান্স সবই বাড়ে। ফিলিপাইন এটি করতে পেরেছে। আর সে কারণেই তারা দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ অদক্ষ শ্রমিক পাঠায়, যে কারণে আয় কম হয়।’
আবার নিরক্ষরতার উচ্চ হারের কারণে সামাজিক বিশৃঙ্খলাও বেশি দেখা যায় বলে জানান মজিবুর রহমান।
রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের অভাব
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোনো দলই দেশকে শতভাগ নিরক্ষরমুক্ত করার কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও দলটি সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘স্মার্ট শিক্ষক এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির বদলে আমরা ডিজিটাল ক্লাসরুম এবং স্মার্ট বোর্ডের দিকে বেশি নজর দিই। কারণ, সেখানে কেনাকাটার বিষয় থাকে, আর্থিক লেনদেন এবং দুর্নীতির সুযোগ থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অথচ বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করা সম্ভব। এজন্য কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।’
তিনি শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে স্থানীয় মানুষদের সাক্ষর করে তোলার পরামর্শ দেন।
মজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘সরকার একটি ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ঘোষণা করতে পারে, যেখানে ‘ইচ ওয়ান, টিচ ওয়ান’ (একজন অন্য একজনকে শেখাবে) মডেলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষিত মানুষ অংশগ্রহণ করতে পারেন।’
১৯৯৬ সালের পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনকে যুক্ত করে অনুরূপ একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং এর ইতিবাচক ফল পাওয়া গিয়েছিল। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, সরকার যদি অগ্রাধিকারভিত্তিতে কোনো কর্মসূচি হাতে নেয়, তবে ২ থেকে ৩ বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সাক্ষরতা অর্জন করা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি কিউবার নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযানের কথা তুলে ধরেন।
রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার কারণে নিরক্ষরতা দূরীকরণ কর্মসূচি পিছিয়ে গেছে। তবে কেবল প্রশাসন দিয়ে এটি সম্ভব নয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একেক এলাকার চাহিদা একেক রকম। সেই ভিন্নতা বিবেচনা করেই প্রকল্প তৈরি করা উচিত। কারণ, একই কৌশল সব জায়গায় কাজ করবে না।’


