‘জিনের’ খপ্পড়ে র‌্যাব কর্মকর্তার স্ত্রী, খুইয়েছেন টাকা-স্বর্ণালংকার

‘জিনের’ খপ্পড়ে র‌্যাব কর্মকর্তার স্ত্রী, খুইয়েছেন টাকা-স্বর্ণালংকার
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে নগদ ১৪ লাখ টাকা ও ১০ ভরি স্বর্ণালংকার খুয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী। ওই পুলিশ কর্মকর্তা র‌্যাবে কর্মরত। তার স্ত্রী বিসিএস ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা। র‌্যাব কর্মকর্তার গাড়িচালক ও তার স্ত্রী মিলে এই প্রতারণা জাল সাজিয়েছেন।

জিনের মাধ্যমে বশীকরণ, পানি পড়া ও তাবিজ-কবজের কথা বললে পুলিশ কর্মকর্তা স্ত্রী তা বিশ্বাস করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার তুলে দিয়েছেন তার গাড়িচালক মো. রাসেল ও তার স্ত্রী মোছা. মাছুরা বেগমের হাতে। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

গত আগস্ট মাসে সংঘটিত এই ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ ও র‍্যাব। মামলার তদন্তে চোরাই স্বর্ণালংকার কেনাবেচার সূত্র ধরে রবিবার রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সাবেক ছাত্রী মমতাজ আরা বর্ষাকে র‍্যাবের গাড়িতে তুলতে গেলে বিপত্তি বাধে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের হস্তক্ষেপে ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়েই ঘটনাস্থল ছাড়ে র‍্যাব।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত ২২ জুলাই। ওই দিন বিকাল আনুমানিক ৫টার দিকে র‌্যাব-২ এ কর্মরত সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হাসান মুহাম্মদ মুহতারিমের স্ত্রী নওরীন হকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তার গাড়ি চালক মো. রাসেল।

রাসেল তাকে (নওরীন) জানান, ‘তার স্ত্রী মাছুরা বেগমের মাধ্যমে এমন একজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব। যিনি জিনের মাধ্যমে পরিবারের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন। পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ও বশীকরণের মাধ্যমে পারিবারিক বিপদ দূর করা এবং চাকরিতে উন্নতি করাও সম্ভব বলে দাবি করা হয়।’

এরপর রাসেল তার স্ত্রী মাছুরা বেগমের সঙ্গে নওরীন হকের ফোনে কথা বলিয়ে দেন। এজাহারে বলা হয়েছে, মাছুরা নিজেকে জিনের মাধ্যমে কথা বলা ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। পরে কথিত জিনের নির্দেশ অনুযায়ী বিভিন্ন কাজ করতে এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে বলে নওরীনকে জানানো হয়।

যেভাবে হাতানো হয় টাকা ও স্বর্ণ

গত ১২ আগস্টের ক্যান্টনমেন্ট থানার এজাহার অনুযায়ী, ২২ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে মো. রাসেল ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন ইসিবি চত্বরের একটি বাসায় যাতায়াত করেন। সেখানে পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ও কথিত বশীকরণের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা বলে নওরীন হককে নানা বিষয়ে বিশ্বাস করানো হয়।

অভিযোগ করা হয়েছে, এ সুযোগে কৌশলে বাসা থেকে নগদ ১৪ লাখ টাকা এবং প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণালংকার, যার আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ টাকা, নিয়ে যাওয়া হয়। সব মিলিয়ে বাদীর প্রায় ৩৯ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, কথিত জিনের নির্দেশ ও ভয়ভীতি দেখানোয় নওরীন বিষয়গুলো বিশ্বাস করতে থাকেন। একপর্যায়ে আরও টাকা দাবি করা হলে তার সন্দেহ হয়। পরে তিনি বিষয়টি তার স্বামীকে জানান। এরপর বিষয়টি যাচাই করে পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, রাসেল ও তার স্ত্রী পরিকল্পিতভাবে জিন ও অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলে তার স্ত্রীর সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছেন।

আরও পড়ুন

এজাহারে দাবি করা হয়েছে, কথিত পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ও অন্যান্য কার্যক্রমের কারণে নওরীন হক শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ ছাড়া তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।

চোরাই স্বর্ণ বিক্রি

মামলার এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে বাদী জানতে পারেন, চুরি যাওয়া স্বর্ণালংকার পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকার এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এ বিষয়ে মোবাইল ফোনের কথোপকথনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ তার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলেও এজাহারে দাবি করা হয়েছে।

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার পর তদন্তে চোরাই স্বর্ণালঙ্কার কেনাবেচার বিষয়টিও সামনে আসে। মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার হলে তাদের দেওয়া সূত্র ধরেই পরবর্তী সময়ে পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় অভিযান চালানো হয়।

শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে র‍্যাবের অভিযান

রোববার সকালে রাজধানীর পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের একটি মেসে অভিযান চালায় র‍্যাব। সেখানে নাট্যকলা বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের সাবেক শিক্ষার্থী মমতাজ আরা বর্ষাকে র‍্যাবের গাড়িতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রক্টরিয়াল টিম ঘটনাস্থলে যায়। তাদের হস্তক্ষেপে ওই শিক্ষার্থীকে সঙ্গে না নিয়েই র‍্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর আহমেদ ইহসানুল কবির বলেন, খবর পাওয়ার পর তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, একজন শিক্ষার্থীকে র‍্যাবের গাড়িতে তোলা হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থীকে নিয়ে যাওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অবহিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়। শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকলে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ছাত্রীকে র‍্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়ার চেষ্টা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে র‍্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইং এর উপ পরিচালক মেজর মো. মাহমুদুল আহসান বলেন, আসামি তো আসামি, সে সারা বাংলাদেশে অভিযুক্ত। মামলা ক্যান্টনমেন্ট থানায় কিন্তু অভিযুক্ত ছিল কলতাবাজারে। তাই র‍্যাব-২ অভিযান চালায়। একটি ব্যাটালিয়ন চাইলে আরেকটি ব্যাটালিয়নকে দায়িত্ব দিতে পারে।

তবে, বর্ষা দাবি করেছেন, তার বোনের পারিবারিক বিরোধের সূত্রে তাকে এই অভিযোগে জড়ানো হয়েছে। তিনি চোরাই স্বর্ণালংকার কেনেননি।

সূত্রাপুর থানার ওসি মো. মতিউর রহমান বলেন, ‘র‍্যাব সদস্যরা একটি মামলার অভিযোগে ওই শিক্ষার্থীকে নিতে এসেছিল। পরে আমরা জানতে পারি, এটি পারিবারিক বিরোধের কারণে করা একটি মামলা। পরে ওই শিক্ষার্থীকে না নিয়ে তারা চলে যায়।’

পুলিশ বলছে যোগসূত্র আছে

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসান জানান, ‘থানায় দায়ের করা চুরির মামলার ভিত্তিতে চোরাই স্বর্ণালংকার কেনার অভিযোগ তদন্ত করতে র‍্যাব ওই অভিযান চালায়। এএসপির বাসা থেকে প্রায় ৩৯ লাখ টাকার নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার চুরি হয়েছিল। মামলার দুই আসামি গ্রেপ্তার হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো মালামাল উদ্ধার হয়নি। এ বিষয়ে পুলিশ র‍্যাবকে রিকুইজিশন দিয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘এজাহারে মমতাজ আরা বর্ষার নাম উল্লেখ করে চোরাই স্বর্ণালঙ্কার কেনার অভিযোগ করা হয়েছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে চুরি যাওয়া মালামাল সম্পর্কে তথ্য বা আলামত পাওয়া যেতে পারে–এমন তথ্যের ভিত্তিতেই র‍্যাব সেখানে গিয়ে থাকতে পারে।’

তবে বর্ষার ছোট বোনের সাবেক স্বামী সুমন মিয়ার র‍্যাবের আইটি বিভাগে কাজ করা কিংবা পারিবারিক বিরোধের জেরে তাকে অপহরণের চেষ্টার অভিযোগের বিষয়ে প্রথমবার শুনছেন বলে দাবি করেন ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর