থমকে আছে আধুনিকায়ন: ঋণে চলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন

থমকে আছে আধুনিকায়ন: ঋণে চলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন
Advertisement
Advertisement

দেশের একমাত্র সরকারি সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাতক সিমেন্ট কারখানার আধুনিকায়ন প্রকল্প শুরুর ১১ বছর পরও কাজ শেষ হয়নি। এই প্রকল্পের মেয়াদ আরও দেড় বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বর্তমান সরকার।

২০১৬ সালে শুরু হওয়া এই আধুনিকায়ন প্রকল্পের খরচ ৬৬৭ কোটি টাকা থেকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে বর্তমানে ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

চুনাপাথর ও গ্যাস সংকটের কারণে গত ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে কারখানাটিতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন, যা মেটাতে কর্তৃপক্ষকে ঋণ করতে হচ্ছে।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে প্রায় ২০০ জন কর্মচারী আছেন। তাদের পেছনে মাসে বেতন বাবদ খরচ হয় এক কোটি ১০ লাখ টাকা থেকে এক কোটি ২০ লাখ টাকা।

প্রকল্প পরিচালক ও কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুর রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ২০২৭ সালের জুনের আগে উৎপাদনে ফেরা সম্ভব নয়। ফলে কাজ যত দেরি হবে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে ঋণের বোঝাও তত বাড়বে।

কারখানাটি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও গত সাড়ে ছয় বছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতেই ৮৬ থেকে ৯৪ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্থায়ী হওয়ায় তাদেরকে অন্য কোথাও বদলি করা যেত। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও তাদের বসিয়ে রাখা হয়নি। তারা কারখানার যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা এবং পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের মতো জরুরি দায়িত্ব পালন করেন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্প কর্তৃপক্ষের অবহেলার তীব্র সমালোচনা করেছে। একই সঙ্গে একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে জরুরি ভিত্তিতে চুনাপাথরের বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের জন্য সরকারকে তাগিদ দিয়েছে।

আইএমইডি সতর্ক করে বলেছে, সময়মতো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকারের বছরে প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

২০১৬ সালের মার্চে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) এই আধুনিকায়ন প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এখন আবার মেয়াদ দেড় বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৯২ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৭৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

ইনফোগ্রাফিক্স: টাইমস

কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক হওয়া সত্ত্বেও ২০২৩ সালের মার্চে তৈরি হওয়া এই আধুনিক কারখানাটি সাড়ে তিন বছর ধরে অলস পড়ে আছে। একদিকে ভারত অংশে চুনাপাথর পরিবহনের রোপওয়ের একটি অংশ নির্মাণ করা হয়নি, অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন এখনো বাকি।

 

এই রোপওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার, যার মধ্যে ১১ কিলোমিটার বাংলাদেশে এবং ৬ কিলোমিটার ভারতে অবস্থিত। বাংলাদেশ অংশের কাজ চললেও ভারত অংশের কাজ এখনো শুরুই হয়নি।

আরও পড়ুন

চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নানজিং সি-হোপ সিমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড কারখানা আধুনিকায়নের কাজ করছে। তবে কারখানার সূত্র মতে, ভারত সরকার এই চীনা কোম্পানিকে তাদের অংশে কাজ করার অনুমতি না দেওয়ায় প্রকল্পটি আটকে যায়।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকার ও মূল ঠিকাদার সাব-কন্টাক্টর হিসেবে ভারতীয় কোম্পানি ‘কমোরা লাইমস্টোন মাইনিং কোম্পানি’ (কেএলএমসি) ভারতের অংশটি নির্মাণ করবে বলে রাজি হয়।

গত ৫ এপ্রিল এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে কেএলএমসি জানায়, খনি ইজারা পাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং ইজারা চূড়ান্ত হলেই রোপওয়ে বসানোর কাজ শুরু করা যাবে।

আবদুর রহমান জানান, প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করতে দুই সদস্যের একটি দল ভারতে গিয়েছিল। সেখান থেকে কাজটি দ্রুত শেষ করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

নতুন কারখানায় দিনে দেড় হাজার মেট্রিক টন ক্লিনকার এবং ৫০০ মেট্রিক টন সিমেন্ট উৎপাদন সম্ভব, যা পুরোনো কারখানার ক্ষমতার প্রায় তিন গুণ। তবে এটি চালাতে গ্যাসের প্রয়োজনও বেশি হবে।

জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড আগে ছাতক এলাকার মূল লাইন থেকে পুরোনো কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করত। নতুন প্ল্যান্টের জন্য একটি পৃথক গ্যাস পাইপলাইনের প্রয়োজন।

জালালাবাদ গ্যাসের তত্ত্বাবধানে সিলেটে অবস্থিত কারখানা পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটারের একটি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন তৈরির কাজ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ‘চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড’ (সিডিডিএল)-কে দেওয়া হয়েছে। সিডিডিএল ইতোমধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ করেছে, ১৩৬ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে এবং জরিপ কাজও শুরু হয়েছে।

মূল প্রকল্পে এই গ্যাস পাইপলাইনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না, যার কারণে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের খরচ অনেকটা বেড়ে যায়।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৬৭ কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে ৮৯০ কোটি টাকা এবং অবশেষে ১ হাজার ৪১৮ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়।

এখনো বেশ কিছু যন্ত্রপাতি কেনার দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং গুদামঘর নির্মাণের কাজও অসম্পূর্ণ। এ ছাড়া এসটিজি প্ল্যান্টের দরপত্র প্রক্রিয়াও চলছে।

এই দীর্ঘায়িত সংস্কার কাজকে ‘অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে আখ্যা দিয়েছে আইএমইডি। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ববাজারে যন্ত্রপাতির দাম বাড়ায় সরকার ও কোম্পানির অতিরিক্ত আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

আইএমইডি আরও উল্লেখ করে, রোপওয়ের ভারত অংশের বাইরের কাজগুলো আরও আগেই শেষ করা উচিত ছিল। রোপওয়ে এবং অন্যান্য কাজ ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে শেষ হবে মর্মে প্রকল্প পরিচালক প্রত্যয়ন করলেও সেই লক্ষ্যপূরণ হয়নি।

প্রকল্পের বয়স ১০ বছরের বেশি হওয়া সত্ত্বেও রোপওয়ের বাংলাদেশ অংশ কেন অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের চিহ্নিত করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি।

সংস্থাটি জানায়, এই দীর্ঘ বিলম্ব প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ফুটিয়ে তোলে এবং নতুন করে বাড়ানো মেয়াদের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি করে।

এই বিলম্ব আরও বেশি চোখে পড়ে কারণ একই এলাকায় পরিচালিত বেসরকারি খাতের সিমেন্ট উৎপাদক ‘লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ লিমিটেড’ লাভজনকভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

তাই আইএমইডি একক কোনো দেশের ওপর নির্ভর না করে অবিলম্বে চুনাপাথরের বিকল্প উৎস অনুসন্ধানের জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি তাগিদ দিয়েছে।

এ বিষয়ে আবদুর রহমান বলেন, ‘লাফার্জহোলসিমও মেঘালয় থেকে চুনাপাথর সংগ্রহ করে। তাদের সুবিধা হলো ইজারার অধীনে সেখানে তাদের নিজস্ব খনি রয়েছে। এ কারণেই তারা চুনাপাথর পাচ্ছে এবং উৎপাদন করতে পারছে, যা আমাদের নেই।’

ভারতের একটি কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশের ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চুনাপাথর আমদানির চুক্তি রয়েছে।

এর মধ্যে একটি ভারতীয় চুনাপাথর কোম্পানির মালিকানায় বাংলাদেশকে যুক্ত করা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। কোম্পানিটি মেঘালয় সরকার এবং একজন বেসরকারি অংশীদারের যৌথ মালিকানাধীন, যেখানে বাংলাদেশকে অন্তত ২৫ শতাংশ শেয়ারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি।

এদিকে, একটি কমিটি স্থানীয় একটি কোম্পানির সাথে যৌথ উদ্যোগে সিলেট থেকে চুনাপাথর সংগ্রহের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে। এটি সফল হলে আগামী বছরের জুনের মধ্যে উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হতে পারে।

তবে অন্য কোনো দেশ থেকে চুনাপাথর আনলে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, যা লাভজনকভাবে কারখানা চালানো কঠিন করে তুলবে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর