গড়াই নদী থেকে বেরিয়ে আসা কালীগঙ্গা এখন আর নদী নেই। একদিকে বন্ধ করা হয়েছে উৎসমুখ। থেমে গেছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। অন্যদিকে নদীর বুক কেটে তৈরি হয়েছে পুকুর, মাছের ঘের ও জলাশয়। উঠেছে বসতবাড়ি, দোকানপাটসহ নানা স্থাপনা।
একসময় এই নদীতে বড় নৌকা চলত। জেলেদের জীবিকাও নির্ভর করত নদীর ওপর। এখন কালীগঙ্গার বিস্তীর্ণ অংশ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে।
দখল ও পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদী শুকিয়েছে। কমেছে মাছ। পেশা বদলেছেন জেলে পাড়ার অনেকে। পানি যত কমেছে, দখলের পরিধি তত বেড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রকাশ্যে নদীটি দখল করা হয়েছে। এ কাজে প্রশাসনের কেউ কেউ ঘুষ নিয়ে সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক আবু মনি জুবায়ের রিপন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘নদী দখলে সব দলের নেতাকর্মীরাই জড়িত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নদীর জায়গা দখল করে বিক্রি করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও বেশ কিছু জায়গা নতুন করে দখল হয়েছে।’
তিনি বলেন, এসব বিষয়ে একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও দখল বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, জেলার নদ-নদী ও খালের বিভিন্ন অংশে অন্তত তিন হাজার দখলদারের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।
৩৫০ মিটার চওড়া নদী এখন ৩০ মিটার
প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কালীগঙ্গার প্রস্থ ছিল এলাকাভেদে ১০০ থেকে ৩৫০ মিটার। এখন অনেক অংশে তা কমে ৩০ মিটারে দাঁড়িয়েছে। কোথাও পুকুর, বাঁধ, ভরাট ও স্থাপনার নিচে নদীর মূল প্রবাহ হারিয়ে গেছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেউরিয়া মহাশ্মশানের পাশে কালীগঙ্গার উৎসমুখ। এই পথেই গড়াইয়ের পানি কালীগঙ্গায় প্রবেশ করে নদীকে সচল রাখত।
প্রায় ৩০ বছর আগে উৎসমুখটি বন্ধ করা হয়। পরে বালু-মাটি ফেলে মুখ আরও সরু করা হয়েছে। কোথাও গড়াইয়ের তলদেশের তুলনায় উঁচু করে দেওয়া হয়েছে উৎসমুখের অংশ। ফলে বর্ষাকালেও গড়াইয়ের পানি স্বাভাবিকভাবে কালীগঙ্গায় ঢুকতে পারে না।
কুমারখালীর সাঁওতা এলাকাতেও কালীগঙ্গার সঙ্গে গড়াইয়ের আরেকটি সংযোগপথ ছিল। সেটিও বাঁধ দিয়ে বন্ধ করা হয়েছে। একের পর এক পানির পথ বন্ধ হওয়ায় নদীর বুক দখল করে গড়ে উঠেছে পুকুর ও স্থাপনা।

কালীগঙ্গার উৎসমুখের কাছে বাহাদুরখালী মৌজায় রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন একরের একটি জলাশয়। এই জলাশয় থেকে সরকার নিয়মিত রাজস্ব আদায় করে আসছে।
উৎসমুখের পাশে বৈধ জলাশয় থেকে সরকার রাজস্ব পাচ্ছে। অথচ একই নদীর বিস্তীর্ণ অংশ কীভাবে ব্যক্তিগত পুকুর, ঘের ও স্থাপনায় পরিণত হলো, এখন সেই প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে যেসব পুকুর তৈরি করা হয়েছে, সেখান থেকে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা উচিত। এতে অন্তত সরকারি কোষাগার বড় হবে। সেই অর্থ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহার করা যাবে।’
নদীর উৎসমুখ থেকে কিছু দূরেই সড়ক। সড়কের ওপর রয়েছে ছোট একটি সেতু। কিন্তু সেতুর নিচ দিয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নেই। এরপর লালন শাহের মাজারসংলগ্ন এলাকায় কালীগঙ্গার চেহারা আরও বদলে গেছে।
২০০০ সালের দিকে লালন মেলার মাঠ তৈরির জন্য নদীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভরাট করা হয়। সেখানে তৈরি করা হয় মাঠ ও একটি জলাশয়। ওই জলাশয় থেকে গত দুই দশকে লালন একাডেমিও আয় করেছে।
এরপর রয়েছে আরও একটি জলাশয়। সরকারি নথিতে এটিকে বাঁওড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জলাশয় ও আশপাশের ভরাট-দখলের ধারাবাহিকতায় কালীগঙ্গার উৎসমুখ কার্যত স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভরা মৌসুমেও উৎসমুখে পানির উপস্থিতি নেই। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান পানি। আবার দখল করা কিছু অংশে মাছ ধরার টিকিটও বিক্রি হচ্ছে।
রিটে বন্ধ রাজস্ব
কালীগঙ্গার সঙ্গে যুক্ত জলাশয় ও জলমহালগুলো সরকারি সম্পদ। নিয়ম অনুযায়ী এসব জলমহাল ইজারা দিয়ে সরকার রাজস্ব আদায় করতে পারে। কিন্তু দখল, মামলা ও ব্যবস্থাপনার জটিলতায় কালীগঙ্গার বদলবাসা জলমহালের মতো জলাভূমিও দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক ইজারা ব্যবস্থার বাইরে ছিল।
কালীগঙ্গা বদলবাসা জলমহালের আয়তন ৬৫ দশমিক ৮৩ একর। এটি দেশীয় মাছের গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। ২০২৩ সালে ইজারাদার মুসা আলী খান হাইকোর্টে রিট আবেদন করার পর ইজারা বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহাবউদ্দিন বলেন, ‘জেলেদের স্বার্থের কথা বলে রিট আবেদন হলেও কোনো জেলে ছিল না। এখন নদীর বিশাল অংশ দখল করে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দখলদারদের আয় হলো, মাছচাষ হলো, স্থাপনা হলো। সরকারের রাজস্ব খাতায় কত টাকা জমা হলো?’
বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের জেলা শাখার সভাপতি খলিলুর রহমান মজু টাইমসকে বলেন, ‘নদী সরকারি সম্পদ। সেখানে ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার সুযোগ নেই। কালীগঙ্গার উৎসমুখ খুলে দেওয়া ও দখলদারদের উচ্ছেদ করা জরুরি।’
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প চালু হলে পানি ধরে রাখতে নদীর প্রয়োজন রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

বদলে গেছে জেলে পাড়া
কালীগঙ্গার মৃত্যু শুধু পানির সংকট নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি জনগোষ্ঠীর পেশা হারানোর ইতিহাস।
একসময় নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল জেলে পাড়া। নদীতে পানি থাকত, পাওয়া যেত দেশীয় মাছ। নৌকা নিয়ে জেলেরা মাছ ধরতেন। সেই মাছ বিক্রি করেই চলত সংসার। নদী শুকিয়ে যাওয়ার পর অনেকে পূর্বপুরুষের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা শামসুল রহমান বলেন, ‘কেউ ভ্যান চালান, কেউ কৃষিকাজ করেন।’
একজন সাবেক জেলে বলেন, ‘নদীতে পানি না থাকলে মাছ থাকবে কীভাবে? মাছ না থাকলে জেলে নদীতে যাবে কেন?’
সাওতা দিয়ে পানি ফেরানোর চিন্তা
কালীগঙ্গাকে আবার গড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে কুমারখালীর সাওতা বাঁধ এলাকায় বিকল্প সংযোগ স্থাপনের চিন্তা করছে সরকার বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা।
তার মতে, ছেউরিয়ার পুরোনো উৎসমুখ পুনরুদ্ধারে তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় হতে পারে। তাই সাওতা এলাকায় বিকল্প সংযোগের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম এ পরিকল্পনার কথা নিশ্চিত করেছেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান টাইমসের প্রশ্নের জবাবে জানান, লালন মাজারসংলগ্ন জলাধারে পানির স্থায়িত্ব নিয়ে তিনি বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে সন্তোষজনক উত্তর পাননি।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তিনটি মন্ত্রণালয় কাজ করতে পারে। এখনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয়।’


