জনপ্রশাসন নিয়ে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে যে আটটি সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ছিল, তার মধ্যে কেবল সরকারি কর্মীদের নতুন পে স্কেল নিয়ে সরকারের উদ্যোগ স্পষ্ট। বাকি সাতটির মধ্যে চারটি ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ ইশতেহারের অঙ্গীকারের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। এ ছাড়া তিনটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগই নেই।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের ছয় দিন আগে বিএনপি তাদের লিখিত ইশতেহার ঘোষণা করে। এতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলার কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু বর্তমানে জনপ্রশাসনে দলীয় বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে দলীয় লোকদের বসানো এবং নিয়োগ পরীক্ষা পদ্ধতি পাল্টানোর উদ্যোগ সেই ইশতেহারের সম্পূর্ণ বিপরীত বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ইশতেহারের ভিত্তিতেই রাজনৈতিক দলগুলো মানুষের ভোট নেয়। তাই ইশতেহারকে জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের চুক্তি বলা চলে। এ কারণে ইশতেহারের বরখেলাপ করা চুক্তি ভঙ্গ করারই নামান্তর।
একইভাবে সাবেক সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার টাইমসকে বলেন, দলগুলো নির্বাচনের আগে সুন্দর সুন্দর কথা বললেও ক্ষমতায় আসার পর সব ভুলে যায়। অতীতেও তাদের কথা ও কাজের কোনো মিল ছিল না, এখনো তার কোনো ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে জনপ্রশাসন সংক্রান্ত প্রথম অঙ্গীকারটি ছিল ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণ’। এতে বলা হয়েছিল বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণই হবে যোগ্যতার মাপকাঠি। কেউ যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করা হবে।
তবে বিএনপির বর্তমান পদক্ষেপগুলোর সঙ্গে এই অঙ্গীকারের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ১৭৯ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দেয়। এই তালিকায় এমন একাধিক কর্মকর্তা ছিলেন যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ সরকারি তদন্তেই প্রমাণিত হয়েছে, এমনকি কারও কারও সাজাও হয়েছিল। যেমন অবসরে পাঠানো মাইনুল হককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের অভিযোগে তিন বছরের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের দণ্ড পাওয়া মোহাম্মদ নজরুল ইসলামও পদোন্নতি পেয়েছেন। নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকার সময় বালুমহাল কেলেঙ্কারিতে এক বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমনের দণ্ড পাওয়া মো. শাহীনুর ইসলামও যুগ্মসচিব হয়েছেন।
এ ছাড়া কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে অবহেলার অভিযোগে গত ২৮ মে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বরখাস্ত হওয়া উপসচিব ছাদেকুর রহমানকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অথচ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার তদন্ত এখনো চলমান এবং তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছিল।
বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৮০ জন সচিব মর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রতি চারজনের একজনই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আছেন। এদের মধ্যে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারও আছেন। পাশাপাশি অতীতে বিএনপির হয়ে কাজ করা মো. সামসুল আলমকে নির্বাচন কমিশনে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সরকার অনেক কর্মকর্তার চাকরির বয়স ২৫ বছর হওয়ার পর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে, অসংখ্য কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) ও সংযুক্ত করে রেখেছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলীয় বিবেচনায় নিয়োগের পক্ষে প্রকাশ্যে মন্তব্য করে প্রশ্ন তুলেছেন, পৃথিবীর কোনো দেশে দলীয় নিয়োগ হয় না?
ইশতেহারের দ্বিতীয় ধাপে ছিল স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের কথা, যেখানে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার ভিত্তিতে মেধাবীদের নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার নিয়োগ পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে, যা নিয়োগের স্বচ্ছতা কমাবে বলে আশঙ্কা তৈরি করেছে।
নতুন পরিকল্পনায় সরকারি চাকরির ১১ ও ১২ গ্রেডে ১০০ নম্বরের লিখিতের বিপরীতে ভাইভায় ৫০ নম্বর; ১৩ থেকে ১৬ গ্রেডে লিখিত ৬০ ও মৌখিক ৪০ নম্বর এবং ১৭ থেকে ২০তম গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক উভয়টিতেই ২৫ নম্বর রাখা হয়েছে।
অথচ সরকারে আসার আগে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিসিএসে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ৫০ বা ১০০-তে নামিয়ে আনার কথা পক্ষে মত দিয়ে বলেছিলেন, এটি করা গেলে দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না।
এদিকে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার শূন্যপদে নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত শেষ করতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে সরকার। আগে এসব পদে নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নিয়ে সুপারিশ করত বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। ফলে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর পাশাপাশি এই সিদ্ধান্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
অঙ্গীকারের পঞ্চম ধাপে ছিল জবাবদিহিতামূলক ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গঠন, যেখানে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যথাযথ সংস্কার, সংবিধানের আলোকে সিভিল সার্ভিস আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে ই-গভর্ন্যান্স চালুর কথা ছিল।
তবে উল্টো পথে হেঁটে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কে কোথায় চাকরি করছেন এবং তাদের বর্তমান চাকরির অবস্থা সরাসরি সাধারণ জনগণের জানার পথ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। জনপ্রশাসনের সরকারি ওয়েবসাইটে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ৬ হাজারের বেশি কর্মকর্তার তথ্য ছিল, যেখান থেকে নাগরিকরা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও ওএসডি সংক্রান্ত তথ্য জানতে পারতেন। এই ওয়েবসাইটে এখন আর সেসব তথ্য নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান টাইমসকে বলেন, ওয়েবসাইট থেকে কর্মকর্তাদের তথ্য সরিয়ে ফেলে সরকার জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করছে, যা তথ্য অধিকার আইনের বিরোধী।
ইশতেহারের অষ্টম অঙ্গীকারে ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পেশাদারত্ব বৃদ্ধি ও দলীয়করণ রোধ। এতে লেখা হয়েছিল, বিএনপি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ব্যক্তির বিশ্বাস-অবিশ্বাস বা দলীয় আনুগত্য বিবেচনা না করে কেবল সততা, দক্ষতা, মেধা, যোগ্যতা, দেশপ্রেম ও অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে প্রশাসন, পুলিশ ও সকল প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের কয়েক মাস পরই দলীয় নেতাদের বিভিন্ন সংস্থায় বসানো শুরু করে। গত ২৩ জুলাই ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপির ১২ নেতাকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়। এর আগে গত ১০ জুন দেশের আটটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদেও বিএনপি নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, যে তিনটি অঙ্গীকার পূরণে কোনো পদক্ষেপ নেই তার মধ্যে রয়েছে চতুর্থ ধাপের ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন। প্রশাসননিক সংস্কারের জন্য যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে এই কমিশন গঠন করার কথা বলেছিল বিএনপি।
ষষ্ঠ অঙ্গীকারে ছিল শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) গঠনের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেক্টরে নিয়োগের জন্য এটিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করা। সপ্তম ধাপে ছিল বেসরকারি চাকরিজীবীরা যাতে ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, সেজন্য ‘বেসরকারি সার্ভিস রুল’ প্রণয়ন করা।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান টাইমসকে বলেন, গত ছয় মাস ধরে দেখা যাচ্ছে সরকার প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। এই উদ্দেশ্যে অনেক জায়গায় দলীয় লোকদের বসানো হচ্ছে। সরকার পুরো ব্যবস্থার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলে মনে করেন তিনি।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারীর ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর সহকারী একান্ত সচিব মীর সোলাইমান জানান, ব্যস্ত থাকায় উপদেষ্টা এখন বক্তব্য দিতে পারবেন না।


