ফ্ল্যাট বাড়িতে খরচ বাড়াচ্ছে লোডশেডিং

ফ্ল্যাট বাড়িতে খরচ বাড়াচ্ছে লোডশেডিং
প্রতীকী ছবি
Advertisement
Advertisement

রাজধানী ঢাকায় তীব্র লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা ফিরে আসায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য এখন মানুষের ভিড় বাড়ছে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে।

পুরান ঢাকার নবাবপুর কমপ্লেক্স, গুলিস্তান স্টেডিয়াম মার্কেট, কাপ্তান বাজার, মালিবাগ ও মৌচাকসহ বিভিন্ন মার্কেটে দিনভর দেখা গেছে বিদ্যুৎ স্টোরেজের সরঞ্জাম কেনার হিড়িক। সারাদিন অফিস বা কাজ শেষে বাসায় ফিরে বিদ্যুৎ না থাকা এবং সন্তানদের ক্লাস-পরীক্ষার সুরক্ষায় বাধ্য হয়েই মানুষ অতিরিক্ত খরচে আইপিএস, সোলার প্যানেল, চার্জার ফ্যান ও লাইট কিনছেন।

নবাবপুর কমপ্লেক্সে আইপিএস কিনতে আসা ফরিদ উদ্দিন আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, সারাদিন কাজ শেষে বাড়ি ফিরে বিদ্যুৎ না থাকায় এবং বাচ্চাদের পড়াশোনার কষ্টের কথা ভেবে বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত দামে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে আইপিএস কিনেছেন। দাম বেশি হলেও বিদ্যুৎ না থাকলে অন্তত ফ্যান ও লাইট জ্বলবে–এতটুকু সান্ত্বনা নিয়েই তিনি বাড়ি ফিরছেন।

একই ক্ষোভ প্রকাশ করে আরেক ক্রেতা জয়িতা চ্যাটার্জি জানান, চরম ভোগান্তিতে পড়ে কোনো উপায় না দেখেই তারা এসব সরঞ্জাম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে আইপিএস ও ব্যাটারির দাম লাফিয়ে বেড়েছে। বিক্রেতাদের মতে, গত তিন মাসের ব্যবধানে আইপিএসের দাম গড়ে প্রায় ৩২ শতাংশ, ব্যাটারির দাম ২৭ শতাংশ এবং চার্জার ফ্যানের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক চুলার দামও বৃদ্ধি পেয়েছে।

জিগাতলার লিংকন ইলেকট্রনিক্সের মালিক মো. সৈকত হাসান জানান, গত কয়েক দিনে আইপিএস বিক্রির পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যা তিনি গত কয়েক বছরেও দেখেননি। আবার তেজগাঁওয়ের ‘সানজোগ পাওয়ার প্যাক’-এর কর্মচারী তারিকুল জানান, আগে যেখানে দিনে ১০-১২টি আইপিএস বিক্রি হতো, এখন তা বেড়ে দিনে ৩০ থেকে ৪০টিতে দাঁড়িয়েছে। তিনি আরও জানান, ক্রেতারা এখন সৌরবিদ্যুৎচালিত আইপিএসের দিকেও বেশ আকৃষ্ট হচ্ছেন।

এদিকে কাপ্তান বাজারের ‘জেজে পাওয়ার হাউস’-এর মালিক গাউস জানান, ব্যাটারি প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর ফলে গত দুই মাসে বাজারে ব্যাটারির দাম ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।

আরও পড়ুন

আইপিএসের খরচ ও ক্ষমতার ধরন সম্পর্কে মালিবাগের মিম ব্যাটারি হাউজের বিক্রেতা শাহ আলম জানান, একটি ছোট পরিবারের ২টি ফ্যান ও ৩-৪টি লাইট চালানোর মতো ৪০০ ভোল্ট অ্যাম্পিয়ারের ৩২০ ওয়াট আইপিএস মেশিনের দাম পড়ে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা। তবে এটি সচল রাখতে অন্তত ৮০০ অ্যাম্পিয়ার-আওয়ারের ব্যাটারি প্রয়োজন, যার দাম শুরু হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে।

অন্যদিকে, ১ হাজার ওয়াটের আইপিএস-এর দাম ১৪ হাজার টাকা এবং এর ব্যাটারির দাম প্রায় ২৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া ভালো ব্র্যান্ডের ৫০০ ওয়াটের একটি পূর্ণাঙ্গ আইপিএস ও ব্যাটারির সেট কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৫২ হাজার টাকা।

সোলার আইপিএসের ক্ষেত্রে ১২০০ ওয়াটের ইনভার্টার ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকায় এবং প্রয়োজনীয় লিথিয়াম ব্যাটারি ২৮ থেকে ৩১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি ৩টি লাইট ও ২টি ফ্যান চালানোর উপযোগী ৫০ ওয়াটের সোলার প্যানেল কিনতে লাগছে প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা।

আইপিএস ও ব্যাটারির এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আমদানির ঘাটতি, কাঁচামালের সংকট ও লোডশেডিংকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। গুলিস্তানের এমবি ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক হোসেন জানান, এ বছর আইপিএস আমদানি কম হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে ব্যাটারিতে ব্যবহৃত ডিস্টিল্ড ওয়াটারের আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

যার ফলে আগে ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া পানির একটি জার এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। হ্যামকো করপোরেশন লিমিটেডের সিনিয়র পণ্য ব্যবস্থাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, ভারত থেকে আইপিএস আমদানি কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

পাশাপাশি কারখানায় ব্যাটারির প্লেট চার্জ করা ও যন্ত্রাংশ তৈরিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়া এবং ডিজেলের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াকে মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করছেন প্রস্তুতকারকরা।

আইপিএস ছাড়াও যে সমস্ত ফ্ল্যাট বাড়িতে জেনারেটর রয়েছে, সেখানেও বাসিন্দাদের পকেট খালি হচ্ছে। মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ভবনের মালিক আবদুস সালাম জানান, ১১২ টাকা লিটার দরের ডিজেলে ১ ঘণ্টা জেনারেটর চালাতেই তাদের খরচ হয় ৪১৪ টাকা। দিনে গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা জেনারেটর চালানোর ফলে মাসে আড়াইশো লিটারের বেশি ডিজেল লাগে। ফলে শুধু জেনারেটর বাবদই প্রতি ফ্ল্যাটকে মাসে অতিরিক্ত দুই হাজার টাকা খরচ করতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে বহুমুখী আর্থিক চাপে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর