রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ দর্শনার্থীদের তদবিরের চাপে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে সচিবালয়ের প্রশাসনিক স্বাভাবিক কাজকর্ম। দপ্তরগুলোতে বিভিন্ন আবদার ও তদবির নিয়ে প্রবেশ করা মানুষের ভিড়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রীরা পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দুটিতে এখন প্রবেশ পাসের অনিয়ম ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো কোনো কাজেই আসছে না।
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই সচিবালয়ে দর্শনার্থী প্রবেশের সুযোগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিগত সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাস নীতিমালায় মন্ত্রী, সচিব ও অন্য কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে দিনে সীমিত সংখ্যক পাসের বিধান থাকলেও বর্তমানে তা বহু গুণ বেড়ে গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বর্তমানে দিনে একজন মন্ত্রী ২৫ থেকে ৩০টি, সচিব ১০টি, অতিরিক্ত সচিব পাঁচটি এবং যুগ্ম সচিব তিনটি পর্যন্ত পাস দিচ্ছেন। সচিবালয়ে ৪০টিরও বেশি মন্ত্রণালয় দৈনিক অন্তত ১ হাজার ৬০০টি বৈধ পাস ইস্যু করছে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন আনুমানিক দেড় শতাধিক মানুষ অবৈধভাবে সচিবালয়ে প্রবেশ করছে। এমনকি নির্ধারিত ‘দর্শনার্থী মুক্ত’ সোম ও বৃহস্পতিবারও সেখানে বাইরের মানুষের ভিড় দেখা যায়।
নিরাপত্তা শিথিলতা এবং আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে প্রবেশের একাধিক অভিযোগও উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, অনেক সময় পদস্থ কর্মকর্তাদের নিজস্ব যানবাহনেও পরিচয়ের তদারকি ছাড়াই বহিরাগতরা ঢুকে পড়ে। এতে নিরাপত্তাকর্মীদের পক্ষে তল্লাশি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া গেটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে দর্শনার্থী প্রবেশেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাগুরার শ্রীপুর থেকে আসা বিশ্বজিৎ চৌধুরী নামে এক দর্শনার্থী জানান, বাইরে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি পুলিশকে ৬০০ টাকা দিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশ করতে পেরেছেন।
অন্যদিকে, রাবেয়া খাতুন নামের এক নারী মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে বদলির তদবিরের কাজে এসে দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও প্রবেশে ব্যর্থ হন।
তবে প্রবেশপথে দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন অবৈধভাবে কাউকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আগের চেয়ে দর্শনার্থী বাড়লেও তিনি অনিয়মে জড়িত নন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ে নানা মত দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একান্ত সচিব মুহাম্মদ হাসনাত মোর্শেদ ভূঁইয়া নিজেকে তদবিরবাজদের কাছ থেকে আড়াল রাখতে নিজের কক্ষ ছেড়ে অন্য কক্ষে নিভৃতে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছেন। তিনি জানান, পুলিশের বদলিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যাপক তদবিরের কারণে স্বাভাবিক রুটিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী গেটে অনিয়মের বিষয়ে মোবাইল কোর্ট চালুর ইঙ্গিত দিলেও অতিরিক্ত সচিব মুনিরা হাফিজ এবং স্বরাষ্ট্র সচিব দাবি করেন, তাদের মন্ত্রণালয় থেকে অবৈধ প্রবেশ ঘটেনি বা দর্শনার্থী বাড়েনি। অন্য মন্ত্রণালয় থেকে অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন স্তরের মন্ত্রী ও সচিবরা। দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, অনবরত তদবিরের যন্ত্রণায় দাপ্তরিক রুটিন কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি।
অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে কাজ করা অসম্ভব হয়ে যাবে।
ধর্ম সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, অতিরিক্ত চাপ সত্ত্বেও তিনি ধৈর্য সহকারে কথা শোনেন। তবে সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার দ্রুত নিয়ন্ত্রিত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজনৈতিক পরিচয় ও আর্থিক স্বার্থই এসব তদবিরের প্রধান উৎস। বিভিন্ন পেশাজীবী ও ক্ষমতাসীন দলের যুব ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতিদিন দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে মানিকগঞ্জে পোস্টিংপ্রাপ্ত চিকিৎসক ফরিদা আক্তার জানান, তিনি পারিবারিক কারণে ঢাকায় বদলির আবেদন নিয়ে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের দেখা পাননি। স্থানীয় সরকার, অর্থ, স্বাস্থ্য, ভূমি, সড়ক পরিবহন ও গণপূর্তের মতো মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রতিনিয়ত প্রচণ্ড ভিড় লেগে থাকে। ৮ নম্বর ভবনের লিফটম্যান আব্দুল গনি জানান, ভিড়ের চাপে তাদের কাজে অতিরিক্ত কষ্ট হচ্ছে।
দর্শনার্থীদের এই অনিয়ন্ত্রিত ভিড়ের প্রভাব পড়েছে সচিবালয়ের দৈনন্দিন নাগরিক সুবিধার ওপর। অতিরিক্ত মানুষের কারণে মধ্যাহ্নের আগেই ক্যানটিনগুলোর খাবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। ৬ নম্বর ভবনের ট্যুরিজম রেস্তোরাঁ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্যানটিনের কর্মী আনিস ও হাসেম আলী জানান, অতিরিক্ত চাপের কারণে বেলা দুইটার মধ্যেই রান্না করা সমস্ত খাবার ফুরিয়ে যায়।
শ্রম মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব রামকৃষ্ণ বর্মন আক্ষেপ করে জানান, দুপুর তিনটার দিকে কাজের ব্যস্ততা শেষে তারা অনেক সময় ক্যানটিন খাবার পান না। বাধ্য হয়ে বাইরে গিয়ে তাদেরকে খাবার খেতে হয়।
সার্বিক অবস্থায় অবিলম্বে সচিবালয়ে প্রবেশাধিকার পুনর্নির্ধারণ ও কঠোর নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দেন সংশ্লিষ্টরা।


