বুকে লেগে গুলি পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়, আদালতে জবানবন্দি

বুকে লেগে গুলি পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়, আদালতে জবানবন্দি
ছবি: বাসস
Advertisement
Advertisement

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও হামলার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন মামুন ফরাজী।

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে তিনি বলেন, এক আন্দোলনকারীর হাতে গুলি লেগে দুটি আঙুল খুলে যায়। আরেকটি গুলি তার বুকে লেগে পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যায়। ওই ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সময় তিনি নিজের মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন বলেও জানান।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে মামুন ফরাজী বলেন, আল্লাহ করিম মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে বাঁশবাড়ি এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন তিনি।

দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ, আনসার বাহিনী, র‌্যাব, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর মুহুর্মুহু গুলি করতে থাকে বলে তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।

মামুন জানান, তখন তারা দৌড়ে জননী কুরিয়ার সার্ভিসেসের গলিতে আশ্রয় নেন। আন্দোলনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় কয়েকজন ওরিয়েন্টাল কোভন নামের একটি আবাসিক ভবনের গেটে আশ্রয় নেন। সেখানে আশ্রয় নেওয়া এক আন্দোলনকারীকে একজন পুলিশ ও একজন আনসার সদস্য টেনে বের করে গুলি করেন বলে দাবি করেন তিনি। মামুনের ভাষ্য, গুলিবিদ্ধ ওই ব্যক্তিকে জননী কুরিয়ার সার্ভিসেসের সামনে আনা হলে তিনি দেখতে পান, তার পা ও পেটে গুলি লেগেছে। পেট থেকে রক্তমাখা ভাত বের হচ্ছিল। পরে তাকে মোটরসাইকেলে করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে জানতে পারেন, ওই ব্যক্তির নাম রাজু এবং ওই দিনই তার মৃত্যু হয়। মামুন বলেন, রাজুকে গুলি করা আনসার সদস্যের নাম ওমর ফারুক।

ওই দিন আছরের নামাজের পর আল্লাহ করিম মসজিদের কাছে বছিলা তিন রাস্তার মাঝামাঝি এলাকার ঘটনার বর্ণনাও দেন মামুন। তার দাবি, বিপরীত দিক থেকে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করতে থাকেন। র‌্যাব হেলিকপ্টার থেকেও ওপর থেকে গুলি করছিল বলে তিনি জবানবন্দিতে বলেন।

আরও পড়ুন

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গুলিতে অসংখ্য আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। তাদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। মামুন বলেন, বিকালে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের গুলির আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় রাস্তায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক আন্দোলনকারী তখন বিভিন্ন গলিতে আশ্রয় নেন। তিনি মেহজাবিন বিউটি পার্লারের সামনে একটি বিদ্যুতের খুঁটির পেছনে আশ্রয় নেন।

সেখান থেকে তিনি দেখতে পান, একজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছেন। মামুনের দাবি, কাছে গিয়ে তিনি দেখতে পান, একটি গুলি ওই ব্যক্তির হাতে লেগে দুটি আঙুল খুলে গেছে এবং আরেকটি গুলি বুকে লেগে পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। তার রক্তে নিজের পরনের কাপড় ভিজে যায় বলেও জবানবন্দিতে জানান তিনি।

মামুন বলেন, ওই ব্যক্তিকে গলির ভেতরে রনি ফার্মেসিতে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন তিনি। চিকিৎসা দেওয়ার সময় নিজের মোবাইল ফোনে ঘটনার ভিডিও করেন। পরে ভিডিওটি ওই ব্যক্তির স্ত্রীর কাছে দেন। এরপর তাকে রিকশায় করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠানো হয়।

আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিজে আহত হওয়ার ঘটনাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন মামুন ফরাজী। তিনি বলেন, ২২ জুলাই মোহাম্মদপুর ফুটওভার ব্রিজের নিচে আনুমানিক বিকেল ৪টার দিকে টিয়ারশেলে আহত হন তিনি। টিয়ারশেলে আহত হওয়ার সময় তার রক্ত বমি হয়েছিল।

এরপর তিনি আর আন্দোলনে অংশ নেননি। জবানবন্দির শেষ পর্যায়ে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা, ফজলে নূর তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশে এবং পুলিশের হাবিবুর রহমান, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, বিপ্লব কুমার সরকার ও রওশানুল হকের সহযোগিতায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের লোকজনকে দায়ী করেন মামুন ফরাজী। তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

মোহাম্মদপুরে হত্যার ঘটনায় ২৮ আসামির মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সাবেক আনসার সদস্য মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন এবং যুবলীগ কর্মী কে এম ফজলে রাব্বী। বাকিরা পলাতক।

মামলার পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন পুলিশের সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশ সদর দপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার এবং মোহাম্মদপুর অঞ্চলের সাবেক এডিসি রৌশানুল হক সৈকত।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা এবং হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ওই দিনের ঘটনায় ফারহান ফাইয়াজ, মো. মাহিন মিয়া ও মো. রনিকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। পরদিন ১৯ জুলাই আল শাহরিয়ার হোসেন, মো. রাজু আহমেদ, মাহামুদুর রহমান সৈকত, মো. ইসমাইল, মো. জসিম উদ্দিন ও জোবায়েদ হোসেন ইমনকে হত্যার অভিযোগও মামলায় আনা হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad